এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৫, ০৪:০৮ পিএম
বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা যত বাড়ছে, ততই নতুন করে আলোচনায় আসছে ইউরেশিয়ায় রাশিয়ার ভূমিকা ও তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক। মস্কো তার আশপাশের দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে না, তবে ভবিষ্যতের যেকোনো নির্ভরশীলতা—হোক তা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা—রাশিয়ার স্বার্থে যেন বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য এবার কঠিন পরীক্ষার মুখে।
২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরেশিয়ায় নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইরানকে ঘিরে সংকট আরও গভীর হচ্ছে, যা সহজেই গোটা অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে আর্মেনিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক, যেটি দীর্ঘদিনের সামরিক ও অর্থনৈতিক মিত্র, এখন দৃশ্যত টানাপোড়েনের মধ্যে। আজারবাইজানের সঙ্গেও উত্তেজনা বাড়ছে, যদিও তা অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার।
এই প্রেক্ষাপটে, রাশিয়ার প্রতিবেশীরা নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা—সব মিলে ছোট দেশগুলোকে এখন আর্থ-রাজনৈতিক এক জটিল মানচিত্রে পথ চলতে হচ্ছে।
তবে এর মাঝেও রাশিয়ার প্রভাব স্পষ্ট। জুলাই মাসে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। এটি ছিল এক ধরনের কৌশলগত বাস্তবতা স্বীকার করার সিদ্ধান্ত। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক রাজনীতিতে শক্তিশালী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও সামরিক জোটগুলোর মাধ্যমে, রাশিয়া, চীন এবং ভারত মিলে ইউরেশিয়ার নতুন বলয়ের জন্ম দিচ্ছে।
দক্ষিণ ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। এই দেশগুলো এখন আরও স্বাধীন ও সচেতন ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছে। বিশেষ করে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে তাদের নিজের সমস্যা নিজেরাই সামলানোর ক্ষমতা এনে দেবে। রাশিয়া এই প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে।
তবে সামনে রয়েছে আরও জটিল চ্যালেঞ্জ।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা। ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, কিন্তু এর প্রভাব ইতিমধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তুরস্কের বিদেশনীতি প্রায়শই অনিশ্চিত, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের জন্য এই পরিবেশ হবে এক চলমান কৌশলগত পরীক্ষা।
দ্বিতীয়ত, আজারবাইজান ও কাজাখস্তানের তেল-নির্ভর অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ঝুঁকিতে রয়েছে। তেলের দাম পড়ে গেলে, কিংবা মজুত শেষ হয়ে গেলে, বড় ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মধ্য এশিয়াকে সবচেয়ে বেশি ভোগাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং জনসংখ্যার চাপ মিলে আগামী দশকে এক গভীর সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
চতুর্থত, রাশিয়ার প্রতিবেশীরা বৈশ্বিক রাজনীতির অনিশ্চয়তা থেকে নিরাপদ নয়। বড় শক্তিগুলোর মতো অর্থনৈতিক রিজার্ভ বা প্রতিষ্ঠানগত স্থিতিশীলতা না থাকায় ছোট দেশগুলো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তারা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—এই দেশগুলোর রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
ভূগোল, ইতিহাস ও পরিকাঠামোর কারণে রাশিয়া এখনো সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলগুলোর কেন্দ্রীয় শক্তি। তবে গত তিন দশকে এসব দেশ নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে। "পোস্ট-সোভিয়েত" ধারণাটি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। এখন আর পুরনো আদর্শ নয়, সহযোগিতা নির্ভর করছে বাস্তব স্বার্থের ওপর।
রাশিয়া কাউকে নিজের ইচ্ছেমতো চালাতে চায় না। তবে এমন কোন চুক্তিও নয়, যেখানে একতরফাভাবে তার সম্পদ ও সমর্থন ব্যবহার করে কেউ নিজের স্বার্থ উদ্ধার করবে। সেটি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর।
এই কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র মুখ্য নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—তাদের সঙ্গে সম্পর্ক যেন রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব বা স্থিতিশীলতায় আঘাত না আনে। পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতা রাশিয়া স্বাগত জানায়, তবে 'লাঠি' হয়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা নেই।
এই নীতিই প্রযোজ্য দক্ষিণ ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে। প্রয়োজন একটি সুসংহত, সাহসী এবং ভবিষ্যত-ভিত্তিক আঞ্চলিক কৌশল। যেখানে যৌথভাবে একীভবনের পথ তৈরি করা হবে, কিন্তু প্রয়োজনে রাশিয়া নিজের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেবে।
অবশ্য, পুরনো অভ্যাস ভাঙা সহজ নয়। অনেক দেশ এখনো রাশিয়াকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভরসা হিসেবে দেখে, আবার একসঙ্গে অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। এই দ্বৈত কৌশল টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।
এখন সময় এসেছে নতুন মডেলের। যেখানে রাশিয়া হবে সমান অংশীদার—অভিভাবক নয়। ইতিহাস বা আবেগ নয়, স্পষ্ট লাভজনক সম্পর্কই হবে নতুন সংলাপের ভিত্তি।
এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে রাশিয়াকে চাই কৌশলগত ধৈর্য ও স্পষ্ট লক্ষ্য। যেখানে সহযোগিতা হবে পারস্পরিক স্বার্থে, এবং সীমারেখাও থাকবে পরিষ্কার। রাশিয়ার প্রতিপত্তি, সম্পদ ও মর্যাদা যেন সঠিকভাবে কাজে লাগে—এটাই হবে মূল উদ্দেশ্য।
এই অনিশ্চিত, বহু-মেরু বিশ্বে রাশিয়ার নিজ অঞ্চলেই ভূমিকা পালন করতে হবে বাস্তবতা, দূরদর্শিতা এবং স্বার্থরক্ষার কঠিন নীতিতে।
সত্যিকারের ও ভারসাম্যপূর্ণ পার্টনারশিপ কেবল এভাবেই সম্ভব ইউরেশিয়ার পরিবর্তনশীল মানচিত্রে।