এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৫, ০৭:০৮ পিএম
ভারতীয় পণ্যের উপর গড়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক চাপিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ, তাঁরই কোম্পানির বহু প্রোডাক্ট এখনও ‘মেইড ইন চায়না’ ছাপ নিয়ে আমেরিকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে রমরমিয়ে!
এই দ্বিচারিতার মাঝেই প্রশ্ন উঠছে— ট্রাম্পের শুল্ক-রাজনীতির বিরুদ্ধে ভারত কোন পথে এগোবে? জেদ করে আমেরিকার বাজার ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি নেবে নয়াদিল্লি? নাকি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে চাপ তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করবে?
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে রুষ্ট ট্রাম্প ভারতের পণ্যে ২৫% অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়েছেন। ফলে মোট শুল্ক এখন ৫০% ছুঁইছুঁই। এর জেরে ভারতীয় রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিশ্চিত। বিশেষত বস্ত্রশিল্পে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে বলে আশঙ্কা।
এ দিকে, বাংলাদেশের মতো দেশকে শুল্কছাড় দিয়ে ভারতীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় কোণঠাসা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত এপ্রিলেই বাংলাদেশের উপর শুল্ক কমিয়ে দেওয়া হয়, আর ভারতের উপর বাড়ানো হয়।
সব রফতানিতে অবশ্য ৫০% শুল্ক নয়। ট্রাম্পের দেওয়া ‘এক্জ়িকিউটিভ অর্ডার ১৪,২৫৭’ অনুযায়ী— সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, এবং কিছু জটিল খনিজে কোনও শুল্কই বসছে না।
ফলে এই শুল্ক ফাঁক গলে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার মূল্যের ভারতীয় পণ্য এখনও মার্কিন বাজারে বিক্রি হচ্ছে কার্যত বিনা শুল্কে।
ভারতের মোট রফতানি আয় প্রায় ৮,৬৫০ কোটি ডলার, যার মধ্যে ৪০-৫০% এই বিশেষ ছাড়ের আওতায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৫% থেকে কমে ৬.২৫%-এ নামতে পারে ২০২৫-২৬ সালে। ছোট উদ্যোগ ও রফতানি-নির্ভর শিল্পে বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কাও থাকছে।
ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমিয়ে রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়ানো সম্ভব। তবে এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা হয়ে ওঠার ভারতের স্বপ্নে ধাক্কা লাগবে।
আমেরিকার বাজারে দমননীতি মোকাবিলায় BRICS-ভুক্ত দেশগুলিকে নিশানা করছে নয়াদিল্লি। অগস্টে প্রধানমন্ত্রী মোদী যাচ্ছেন চিনে SCO সম্মেলনে। এর পাশাপাশি NSA অজিত ডোভাল রাশিয়ায় গিয়েছেন চুক্তি পাকাপোক্ত করতে।
ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরের আগে সম্ভাব্য তেলচুক্তিও হতে পারে, যা ভারতের শক্তি নির্ভরতা ও খরচ দুইই কমাবে।
আমেরিকা চায় ভারত তার কৃষি ও দুগ্ধ বাজার খুলে দিক। মোদী সরকারের স্পষ্ট অবস্থান— এটা হবে না। কারণ ভারতের ৬০% মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল, আমেরিকার চাষিরা যদি ভারতীয় বাজার দখল করে নেন, তা হলে স্থানীয় কৃষকরা শেষ হয়ে যাবেন।
নিজের প্রচারের মাগা টুপি বা চায়ের কাপ পর্যন্ত ‘মেইড ইন চায়না’!
কলার উপর শুল্ক চাপিয়ে দাম বাড়িয়ে সাধারণ আমেরিকানকেই ঠকিয়েছেন।
আমেরিকার বাণিজ্যসচিব বলছেন— “কলার দাম বাড়া সাময়িক”, অথচ চাষের বাস্তবতা তারা জানেন না।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প আসলে ঘরের ভোটারদের কাছে ‘হার্ড নেগোশিয়েটর’ হওয়ার ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইছেন। কিন্তু আসলে তিনি নিজেই বাণিজ্য ফাঁক গলে নিজের স্বার্থ রক্ষা করছেন।
কৌশলী বাণিজ্য চুক্তি দরকার, যাতে কৃষি ও দুগ্ধ বাজার অক্ষত রেখে লাভজনক সমঝোতা করা যায়।
বিকল্প বাজারে রফতানি বাড়াতে হবে— BRICS, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা।
যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখতে হবে চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত বন্ধুত্ব ব্যবহার করে।
শুল্ক-রাজনীতির খেলায় ট্রাম্প যতই চাপ দিক, ভারতকে এখন গা-ছাড়া করলে চলবে না। বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কূটনৈতিক রণনীতি এবং বিকল্প বাজারের সমন্বয় ঘটিয়ে তবেই ‘ট্রাম্প কার্ড’ খেলতে হবে নয়াদিল্লিকে।