ঢাকা, বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
Logo
logo

গাজায় শিশুদের পানির জন্য কান্না, আর সেই নেতানিয়াহুই ইরানিদের পানি বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন!


এনবিএস ওয়েবডেস্ক  | প্রকাশিত:  ২২ আগস্ট, ২০২৫, ০৫:০৮ পিএম

গাজায় শিশুদের পানির জন্য কান্না, আর সেই নেতানিয়াহুই ইরানিদের পানি বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন!

গাজায় শিশুরা তৃষ্ণায় মরছে, হাসপাতাল বন্ধ হচ্ছে পানির অভাবে—আর ঠিক সেই সময়েই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করছেন, তিনি ইরানের পানি সংকট সমাধান করবেন। ভণ্ডামির এই চিত্র বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল বলছে, গাজায় পানি বন্ধ রেখে মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়েছে ইসরাইল, অথচ বাইরে নিজেদের ত্রাণকর্তা সাজাচ্ছে নেতানিয়াহু।


গাজায় অবরুদ্ধ মানুষ যখন এক ফোঁটা পরিষ্কার পানির জন্য হাহাকার করছে, তখনই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেকে ইরানিদের জন্য “পানি রক্ষাকারী” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর এই ঘোষণা এখন ভণ্ডামির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্টুডিও আলোয় ঝলমল করে নেতানিয়াহু সতর্ক করেছেন—ইরানের পানি সংকটে ৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। আর তিনি ইসরাইলের পক্ষ থেকে ‘সমাধান’ প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরেই গাজায় শিশুদের তৃষ্ণায় মৃত্যু হচ্ছে। যাদের পানি সরবরাহ ইসরাইলই বন্ধ করে দিয়েছে।

গাজায় এখনো মানুষ নোনা, ব্যাকটেরিয়া মিশ্রিত দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। পাইপলাইন ভেঙে গেছে, কূপ বোমায় ধ্বংস হয়ে গেছে, ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলো অকেজো। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ ও ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, কেবল পানির অভাব আর অনাহারের কারণে গত কয়েক মাসেই অন্তত ৩১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় মাথাপিছু পানির প্রাপ্যতা নেমে এসেছিল দৈনিক তিন লিটারেরও কমে। ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ উত্তর গাজায় সেই পরিমাণ এক লিটারেও নামেনি। অথচ একজন মানুষের বাঁচতে দিনে কমপক্ষে পাঁচ লিটার পানি লাগে। এই অবস্থায় ইউনিসেফ বলছে, গাজার শিশুদের জন্য এটা আসন্ন মৃত্যুদণ্ড।

এই পানির সঙ্কট কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট নিজেই ঘোষণা করেছিলেন: “বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই, জ্বালানি নেই—সবকিছু বন্ধ।” এরপরই মেকোরোট নামের পানি সরবরাহকারী সংস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা প্রতিদিন গাজায় ১ কোটি লিটার পানি দিত। ফলে গাজায় মানবসৃষ্ট খরা নেমে আসে।

এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলছে। জেনেভা কনভেনশনে বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য পানি ধ্বংস বা আটকানো নিষিদ্ধ। রেড ক্রসও এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল পানি ও খাবারকে যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করেছে।

গাজার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় খান ইউনিসের ছয় বছরের মরিয়মের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। বোতলজাত পানি না পেয়ে দূষিত ট্যাংকের পানি খেয়ে সে মারা যায়। একইভাবে ৭০ বছর বয়সী হাসানও বাঁচতে পারেননি—কারণ পানির অভাবে তাঁর ডায়ালাইসিস বন্ধ হয়ে যায়।

অতীতেও পানি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ইসরাইল। ২০১৪ সালে গাজার সবচেয়ে বড় বর্জ্য পানি শোধনাগার ধ্বংস করা হয়েছিল, ২০২১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে তৈরি প্ল্যান্টে হামলা চালানো হয়েছিল। প্রতিবারই পুনর্গঠন আটকে যায় ইসরাইলি আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে।

আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। পাকিস্তান একে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ বলছে। চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে তদন্ত দাবি করেছে। অন্যদিকে আমেরিকা ইসরাইলকে রক্ষা করে যাচ্ছে এবং নিরাপত্তা পরিষদের সব প্রস্তাবে ভেটো দিচ্ছে।

গাজার মানুষের চোখে এই ভণ্ডামি স্পষ্ট। একজন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি প্রকৌশলী বলেছেন: “তারা মরুভূমিকে সবুজ করেছে, কিন্তু আমাদের ঘরবাড়িকে মরুভূমি বানিয়েছে।”

নেতানিয়াহু যতই ইরানের পানি রক্ষাকারীর সাজ পরুন, গাজার শুকনো ঠোঁট আর খালি জেরিক্যান হাতে থাকা শিশুদের ছবি তাঁর কথার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে থাকবে।