এনবিএস ওয়েবডেস্ক | প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৫, ০৩:১০ পিএম
দক্ষিণ-পশ্চিম তুরস্কের মুগলা প্রদেশে পাহাড়ঘেরা এক অদ্ভুত নীরব শহর — কায়াকোয়। এক সময় ছিল এটি প্রাণচঞ্চল জনপদ, এখন শুধুই ধ্বংসাবশেষ আর নিঃস্তব্ধতা। ছোট ছোট পাথরের রাস্তা, সারিবদ্ধ পুরনো ঘর, প্রাচীন ঝরনা আর গির্জাগুলো আজও যেন অতীতের গল্প বলে যায়।
খাড়া উপত্যকা থেকে চোখে পড়ে নীলচে এজিয়ান সাগরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। অথচ, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি — প্রায় এক শতাব্দী ধরে এখানে কেউ বসবাস করে না।
এক সময়ের প্রাণবন্ত শহর এখন ‘ভূতের গ্রাম’
কায়াকোয় আজ যেন এক সত্যিকারের ভূতের শহর — যেখানে বাতাসে মিশে আছে ইতিহাসের কষ্ট আর পরিত্যক্ত স্মৃতি।
পাহাড়ের ঢালে সারি সারি ভাঙাচোরা ভবনগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজে। সূর্যের আলোয় ঝলমলে দিন আর কুয়াশায় মোড়া শীতের সকালে, শহরটির সৌন্দর্য এখনো পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
শত বছর আগে ছিল গ্রিকদের প্রাণকেন্দ্র
একসময় এই শহরটির আরেক নাম ছিল লেভিসি Levissi। তখন এখানে বসবাস করতেন কমপক্ষে ১০ হাজার গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিষ্টান, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন দক্ষ কারিগর।
তারা স্থানীয় মুসলিম তুর্কি কৃষকদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতেন। কিন্তু তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং গ্রিক-তুর্কি যুদ্ধের ১৯২২ পর এই বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান ভেঙে যায়।
দুই দেশের মধ্যে জনবিনিময়ের সিদ্ধান্তে, কায়াকোয়ের গ্রিকরা গ্রিসে চলে যান, আর গ্রিসের কাভালা শহরের তুর্কিরা তুরস্কে আসেন।
কিন্তু নতুন আগতরা কায়াকোয়েতে থাকতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর থেকেই শহরটি একেবারে মানবশূন্য হয়ে পড়ে।
চোখের জলে বিদায়, আর ফেরেনি কেউ
কায়াকোয়ের ইতিহাস আজও জীবিত কিছু পরিবারের মুখে মুখে বেঁচে আছে। যেমন, আয়সুন একিজের পরিবার — যাদের দাদা-দাদি একসময় কায়াকোয়ে রাখাল ছিলেন।
তাঁরা এখন শহরের প্রবেশমুখে ছোট একটি রেস্তোরাঁ চালান, যেখানে পর্যটকরা জলখাবার খেতে থামেন।
একিজ আবেগভরে বলেন,
“গ্রিক লোকেরা কাঁদছিল, তারা যেতে চাইত না। কেউ কেউ তাদের সন্তানদের তুর্কি বন্ধুদের কাছে রেখে গিয়েছিল, ভেবেছিল তারা ফিরে আসবে। কিন্তু আর কেউ ফেরেনি।”
তিনি আরও জানান, তখনকার বাড়িগুলোর দেয়াল নীল রঙে রাঙানো ছিল, যা করা হতো বিচ্ছু বা সাপ তাড়ানোর জন্য। আজও সেই নীলচে রঙের ছাপ টিকে আছে কায়াকোয়ের প্রায় ২,৫০০টি বাড়ির অবশিষ্ট দেয়ালে।
সময়ের সীমানায় জমে থাকা এক স্মৃতিস্তম্ভ
আজ কায়াকোয় শুধুই একটি অতীতের ছায়া— যেন জমে থাকা সময়ের মধ্যে এক টুকরো ইতিহাস।
একসময়কার প্রাণবন্ত জীবনের এই নিঃস্তব্ধ ধ্বংসাবশেষ এখন পর্যটকদের কাছে তুরস্কের সবচেয়ে রহস্যময় আকর্ষণগুলোর একটি।