ঢাকা, মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
Logo
logo

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক রাষ্ট্রপ্রধান! ৯২ বছর বয়সেও আবারো ক্যামেরুনের মসনদে পল বিয়া!


এনবিএস ওয়েবডেস্ক  | প্রকাশিত:  ২৯ অক্টোবর, ২০২৫, ০২:১০ পিএম

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক রাষ্ট্রপ্রধান! ৯২ বছর বয়সেও আবারো ক্যামেরুনের মসনদে পল বিয়া!

ক্যামেরুনের সাংবিধানিক পরিষদ ৯২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট পল বিয়াকে টানা অষ্টমবারের মতো নির্বাচিত ঘোষণা করেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি হলেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক রাষ্ট্রপ্রধান।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ২৬ অক্টোবর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। এমনকি বিরোধী প্রার্থী ও সাবেক মন্ত্রী ইসা চিরোমা বাকারি নিজের জয়ের দাবিও করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন পল বিয়া।

৪ দশক ধরে ক্ষমতা, তবুও বিতর্ক থামেনি

পল বিয়া পেয়েছেন ৫৩.৭ শতাংশ ভোট, আর বাকারি পেয়েছেন ৩৫.২ শতাংশ। অনেক ক্যামেরুনবাসীর জন্য এই ফলাফল যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই আবার প্রত্যাশিতও ছিল।

৪৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন প্রেসিডেন্ট বিয়া। এর পরও তার আরও সাত বছরের জন্য প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। শুধু তার দীর্ঘকালীন শাসন নয়, তার শাসনপদ্ধতিও নানা প্রশ্ন তুলেছে।

প্রায়ই তাকে দেশের বাইরে, বিশেষ করে জেনেভার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল বা সুইজারল্যান্ডের হ্রদপাড়ের কোনো গোপন স্থানে থাকতে দেখা যায়। এতে অনেকেই সন্দেহ করেন, তিনি আদৌ ক্যামেরুন শাসন করছেন কি না, নাকি আসলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যরা বা প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের শক্তিশালী সচিব জেনারেল ফার্দিনান্দ এনগোহ এনগোহ।

গত বছর ফ্রান্সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং পরে বেইজিংয়ে চীন-আফ্রিকা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর তিনি প্রায় ছয় সপ্তাহ জনসমক্ষে আসেননি। এতে তার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়। অবশেষে যখন ঘোষণা আসে যে তিনি রাজধানী ইয়াউন্ডেতে ফিরছেন, তখনই তার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। তবুও এ বছর নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও তার জেনেভায় সফর কাউকে অবাক করেনি।

রহস্যময় নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার সমীকরণ

বিয়ার নেতৃত্বের ধরন রহস্যময়। তিনি সচরাচর মন্ত্রিসভার পূর্ণ বৈঠক ডাকেন না বা জনসম্মুখে জটিল ইস্যু নিয়ে কথা বলেন না। ফলে প্রশাসনের লক্ষ্য ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে সবসময় ধোঁয়াশা থেকে যায়।

তবে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র কারণ শক্তি প্রদর্শন নয়। পল বিয়া একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করেন। ক্যামেরুন একটি বৈচিত্র্যময় সমাজ, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং ভাষাগত বিভাজনে গঠিত দেশ—দক্ষিণের বিষুবীয় অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের সাভানা অঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য গভীর, আবার ফরাসি ও ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলগুলোর শিক্ষা ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যও আলাদা। বিয়া এই বিভিন্ন পটভূমির প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠন করে ঐক্য ধরে রেখেছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল IMF এবং বৈদেশিক ঋণদাতাদের চাপের মধ্যেও তার সরকার ঋণসংকট এড়াতে পেরেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল করেছে। গত এক দশকে বিয়াকে অনেকে প্রায় এক ধরনের সাংবিধানিক রাজা হিসেবে দেখেছেন—প্রতীকী এক নেতা, যিনি কেবল কিছু মূল বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন।

উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র জল্পনা

তাকে ঘিরে শাসকদল ক্যামেরুন পিপলস ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট CPDM-এর শীর্ষ পর্যায়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। বিয়া ক্ষমতায় থাকায় উত্তরসূরি নির্ধারণের বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। কোনো মনোনীত উত্তরসূরি না থাকায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের নেতারাও বয়স্ক হয়ে পড়ায়, উত্তরাধিকারের প্রশ্নে গুঞ্জন ক্রমেই বাড়ছে। তার পুত্র ফ্রাঙ্ক বিয়ার নামও শোনা যাচ্ছে, যদিও তিনি রাজনীতিতে তেমন আগ্রহী নন।

দীর্ঘদিনের এই আধা-স্বৈরশাসনের প্রতি ক্যামেরুনবাসীরা কি সহনশীলতা হারাচ্ছে? ইংরেজিভাষী অঞ্চলের রক্তক্ষয়ী সংকট তার সাবধানী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দিয়েছে। ২০১৬ সালে সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হলেও, বিয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় সহিংসতা বেড়ে গিয়েছিল।

বিরোধী শিবিরের ক্ষোভ ও গুলির খবর

২০১৮ সালে সপ্তম মেয়াদে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্তেই জনগণের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। তবুও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী মরিস কামতোকে পরাজিত করেন এবং ফল প্রত্যাখ্যান করায় কামতোকে আট মাসেরও বেশি সময় আটক রাখা হয়। কিন্তু এবার ইসা চিরোমা বাকারির প্রার্থিতা পরিস্থিতি বদলে দেয়।

চিরোমা, একজন মুসলিম উত্তরাঞ্চলীয় রাজনীতিক, তার জনপ্রিয়তা বিস্তৃত করেছেন দেশের নানা অঞ্চলে। একসময় রাজনৈতিক বন্দি থাকলেও, নির্বাচনের আগে তিনি ইংরেজিভাষী শহর বামেন্ডায় গিয়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়ে সাহসিকতার পরিচয় দেন।

ফল ঘোষণার পর বিরোধী শিবিরে ক্ষোভ ও হতাশা তীব্র। অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র দৌয়ালায় বিক্ষোভ দমনে সেনারা গুলি চালিয়েছে বলে খবর এসেছে, গারোয়া থেকেও গুলির খবর পাওয়া গেছে। ক্যামেরুনের জন্য বিয়ার অষ্টম মেয়াদ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা বড় ঝুঁকি ও বেদনাদায়ক মূল্য নিয়ে এসেছে।