এনবিএস ওয়েবডেস্ক | প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠিক কখন ইরানের ওপর হামলা চালাবে—এই প্রশ্ন এখন গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে। কারণ একের পর এক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে আসছে, আর তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধের হুমকি। কিন্তু এই খোলা হুমকির আড়ালে আরেকটি সত্য হলো—পর্দার আড়ালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নীরব আলোচনাও চলছে। আসল কথা হলো, দুই পক্ষই জানে যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ কারও জন্য ভালো নয়, তাই তারা যুদ্ধ এড়িয়ে 'সম্মানজনক কিন্তু শান্তিপূর্ণ' কোনো সমাধান খুঁজছে।
কিন্তু এই সম্মানজনক সমাধানই সবচেয়ে কঠিন। কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক আধিপত্য, শক্তির ভারসাম্য এবং বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী দেশগুলোর তালিকায় পঞ্চম স্থানে। তাই ইরান দখল মানে একদিকে এই বিশাল সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে পুরো এলাকায় মার্কিন-ইসরাইল জোটকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলা।
ইরান শুধু সম্পদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের প্রতিবেশী, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার এক বড় স্তম্ভ। এই একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরিয়ে দিয়ে দেশটির কার্যত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এবং গ্রিনল্যান্ডের দিকেও নজর দিয়েছে।
কিন্তু ইরান ভেনেজুয়েলা বা গ্রিনল্যান্ডের মতো নয়—এটাই আমেরিকা-ইসরাইল জোটের সবচেয়ে বড় বাধা।
এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইরানের ক্ষেত্রে আগের পুরনো কৌশল কাজে লাগানো সহজ নয়। ফলে পর্দার আড়ালের কথাবার্তা চললেও, এর সমাধান দুই পক্ষের জন্যই ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনা চলাকালীনই কোনো ঘোষণা ছাড়াই ইসরাইলকে দিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছিলেন। তাই এবারও অনেকে শঙ্কা করছেন, আলোচনার আড়ালেই হয়তো হামলার প্রস্তুতি চলছে।
বাস্তবতাও সেদিকেই ইশারা দিচ্ছে। আলোচনার মধ্যেই ইরানের চারপাশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে। অনেকটা ১৯৭১-এর মার্চে পাকিস্তানের কৌশলের মতো—একদিকে আলাপ, অন্যদিকে প্রস্তুতি। এই সামরিক জমায়েতের মূল উদ্দেশ্য একদিকে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো, অন্যদিকে ভয় দেখানো। কিন্তু ইরান ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে তারা ভয় পায় না। বরং ঝড়ের মধ্যেও নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা তাদের আছে। আর এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভয়।
সম্প্রতিক ইতিহাস বলে, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে খুব কমই দীর্ঘ ও জোরালো যুদ্ধ করেছে। ইরাকে তারা পুরো ন্যাটো জোট নিয়ে গিয়েছিল, আফগানিস্তানে পেয়েছিল ভেতরের সহযোগী, ভেনেজুয়েলাতেও স্থানীয় শক্তির সাহায্য ছাড়া প্রেসিডেন্টকে এভাবে আটকানো সম্ভব হতো না।
কিন্তু ইরানের জনসংখ্যা ও রাষ্ট্র কাঠামো এই সব মডেলের সাথে মেলে না।
সাম্প্রতিক সংঘাত ও অস্থিরতার পর ইরান ইসরাইলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের অনেকটাই ধ্বংস করলেও, ধারণা করা হয় তাদের কিছু গোপন নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। যুদ্ধ শুরু হলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সেগুলো ব্যবহার করতে পিছপা হবেন না। তবুও শুধু গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক দিয়ে ইরানকে হারানো সম্ভব নয়—সাম্প্রতিক লড়াইয়ে সেটা তারা নিজেরাই বুঝে গেছে।
তাই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোট মূলত অপেক্ষা করছে ইরানের সেনাবাহিনী, বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) ভেতরে ফাটল ধরার জন্য। যেমনটা ইরাকে রিপাবলিকান গার্ডে ফাটল ধরিয়ে হামলা করা হয়েছিল। যতদিন না এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, ততদিন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এর উপর ট্রাম্পের সামনে আছে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ। আগে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের জায়গা-জমি ও আকাশপথ ব্যবহার করতে দিয়েছিল, এবার সেই সমর্থন আর নেই। কারণ শেষ মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে যে সাহায্য করবে, তাকেও দাম দিতে হবে।
এই বার্তার পর মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ মুসলিম দেশই জানিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের আকাশপথ ও ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না। ফলে সম্ভাব্য হামলায় জর্ডান, সিরিয়া ও ইরাক ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর মতো দেশ খুবই কম থাকবে।
তাহলে সব মিলিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে—যুক্তরাষ্ট্র কবে ইরানে হামলা করবে? বাস্তবতা বলছে, যতদিন না ইরানের ভেতর থেকে দুর্বল করা যায় এবং আঞ্চলিক সমর্থন নিশ্চিত হয়, ততদিন এই হামলার হুমকি কেবল মহড়া ও ভয় দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।