এনবিএস ওয়েবডেস্ক | প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ১১:০২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলতে আর বেশি দেরি নেই—ঠিক এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ফের আলোচনার টেবিলে বসছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় তৃতীয় দফার পরোক্ষ পরমাণু আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত করেছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি ।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে আল বুসাইদি জানান, "ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা এখন জেনেভায় এই বৃহস্পতিবার নির্ধারিত হয়েছে, চুক্তি চূড়ান্ত করতে বাড়তি প্রচেষ্টার ইতিবাচক ধাক্কা নিয়ে" ।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই আলোচনায় কিছুটা আশাবাদ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক আলোচনায় "উৎসাহব্যঞ্জক সংকেত" পাওয়া গেছে এবং উভয় পক্ষ ব্যবহারিক প্রস্তাব বিনিময় করেছে । তবে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরান শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকলেও যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলায় শক্ত অবস্থান রক্ষা করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বজায় রাখবে ।
দুই পক্ষের অবস্থান ও প্রত্যাশা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি বৃহস্পতিবার জেনেভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেন । তিনি বলেছেন, দুই পক্ষ সম্ভাব্য চুক্তির উপাদানগুলো নিয়ে কাজ করছে এবং বৃহস্পতিবার একটি খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে ।
আরাগচি আরও বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তির চেয়েও ভালো একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, আগের আলোচনার মতো বিস্তারিত বিবরণে না গিয়ে এবার মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর একমত হওয়া সম্ভব, যাতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি চিরতরে শান্তিপূর্ণ থাকবে এবং একই সঙ্গে আরও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে ।
তবে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে "উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য" রয়ে গেছে, এমনকি "নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরিধি ও পদ্ধতি" নিয়েও ।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধকরণ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক প্রক্সিদের সমর্থন প্রত্যাহারের শর্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের পক্ষে এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া "অত্যন্ত কঠিন" হবে ।
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই কূটনীতি
এই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবিমান ও পরিবহন বিমান মোতায়েন করা হয়েছে । এফ-২২ র্যাপ্টর স্টিলথ ফাইটার জেট, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং কেসি-১৩৫ আকাশ থেকে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে ।
পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের তথ্যের ভিত্তিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, কাতারের আল উবেইদ ঘাঁটি থেকে শত শত সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে । বাহরাইনে নৌবাহিনীর ৫ম ফ্লিটের সদর দপ্তরসহ ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন স্থাপনাগুলোতেও একই ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে ।
সরকারি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এই অঞ্চলে মোতায়েন ৩০ থেকে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা পুরোদমে যুদ্ধ বাঁধলে ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে । সম্প্রতি জাতিসংঘে ইরানের মিশন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন হামলা হলে "এই অঞ্চলে শত্রুপক্ষের সব ঘাঁটি, স্থাপনা ও সম্পদ বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে" ।
ইসরায়েলের ভূমিকা ও উদ্বেগ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সীমিত করার বিষয়টি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে । কিন্তু ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি "কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় নয়, এখন বা ভবিষ্যতেও নয়" ।
গত জুনে ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সম্প্রতি উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান দ্রুতই সেই স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ প্রাক-যুদ্ধ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ।
টেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ রাজ জিমট বলেন, "ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে, মার্কিন সামরিক হামলার ঝুঁকি তার চেয়েও কম—একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকির চেয়ে। তারা বিশ্বাস করে ক্ষেপণাস্ত্র ছেড়ে দিলে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত হবে" ।
সম্ভাবনা ও বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনা অব্যাহত থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়ে গেছে। ইরান শুধু পরমাণু কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা করতে চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা ।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ট্রিতা পার্সির মতে, ইসরায়েলি প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের শক্তিকে খাটো করে দেখাচ্ছে এবং অবাস্তব দাবি তুলতে উৎসাহী করছে। তবে ট্রাম্পের ১০ থেকে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম শেষ হতে এখনও কয়েক দিন বাকি, আর জেনেভা বৈঠক সেই সময়সীমার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে ।
এখন দেখার পালা, ২৬ ফেব্রুয়ারির এই বৈঠক কি যুদ্ধ এড়ানোর পথ তৈরি করবে, নাকি ব্যর্থ হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দরজা খুলে দেবে?