আব্দুল্লাহ সাহেল | প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
ইরানের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ যাত্রায় লাখ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করে দেখিয়ে দিলেন তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব এখনও অটুট রয়েছে। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই, মাশহাদে আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়, যেখানে শিয়া বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থান ইমাম রেজা মাজারে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি (RT) জানায়, এই শোকযাত্রা তেহরান থেকে শুরু হয়ে ইরানের শিয়াদের ধর্মীয় কেন্দ্র কুম হয়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় পৌঁছে, অবশেষে খামেনির নিজ শহর মাশহাদে শেষ হয়। এক সপ্তাহব্যাপী চলা এই শোকযাত্রায় দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়ে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। এর আগে তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ইরানের বিপ্লবোত্তর ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেটি যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বহির্মুখী চাপ ও অভ্যন্তরীণ ঐক্যের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
খামেনি শুধুমাত্র একজন শাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি আদর্শবাদী নেতা, রাজনৈতিক স্থাপত্যবিদ এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাঁর মৃত্যুকে অনেক সমর্থক কেবল রাজনৈতিক অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং ধর্মীয় শোকাহত ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
দাফনের অনুষ্ঠানে সরকারী ব্যবস্থাপনা থাকলেও, এত বিশাল জনস্রোত শুধুমাত্র প্রশাসনিক আদেশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে সংগঠিত সম্ভব নয়। আরটি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুমানিক কয়েক মিলিয়ন মানুষ ইরানের বিভিন্ন শহরে শোক প্রকাশ করেছেন। যদিও বিরোধী পক্ষ ও বিদেশি প্রচার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম দেখানোর দাবি করলেও, এই জনসমাগম ইরানের সমাজ ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রকৃত প্রতিফলন।
ইরানের সামাজিক কাঠামো একরকম নয়; দেশে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক চাপ ও সংস্কারের দাবিসহ নানা সমস্যা বিদ্যমান। তবুও, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য শুধুমাত্র একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি জাতীয় মর্যাদা ও বহিরাগত চাপে প্রতিরোধের প্রতীক।
খামেনির প্রতি সমর্থকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল একটি জনপ্রিয় উক্তি, “আল্লাহ আসমানে, খামেনি পৃথিবীতে।” এই উক্তি তাঁর নেতৃত্বের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বোঝায়, যেখানে তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক, রক্ষক ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।
খামেনি ১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং শিয়া ধর্মীয় শিক্ষায় প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৯ এর ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
খামেনির দাফন ও তার প্রতি জনসমর্থন ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে তাঁর অবিস্মরণীয় স্থিতি প্রমাণ করে। এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে যখন দেশটি বহিরাগত চাপ ও অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। এই জনসমাগম ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ ও অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি ইরানের শক্তি ও ঐক্যের বার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে, যা পশ্চিমা ও ইসরায়েলি সমালোচনার মুখেও তাঁর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখছে।