রশিদ খান—আফগান ক্রিকেটের প্রথম বিশ্ব তারকা! ১৭ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক অভিষেক থেকে আইপিএল-এ হ্যাটট্রিক, তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে ঝড় তুলেছেন। তার লেগ-স্পিন আর প্রতারণামূলক গুগলি কীভাবে ব্যাটারদের নাস্তানাবুদ করে? কীভাবে তিনি আফগানিস্তানকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নিয়ে গেলেন? এই গল্পে রয়েছে প্রতিভা, সংগ্রাম আর বিশ্বজয়।

আফগানিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র রশিদ খান, যিনি তার অসাধারণ লেগ-স্পিন বোলিং দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৯৯৮ সালে নাঙ্গারহারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ক্রিকেটার মাত্র ১৭ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেন। তার দ্রুত গতির গুগলি এবং নিখুঁত লাইন-লেংথ ব্যাটারদের জন্য দুঃস্বপ্ন। আজ আমরা তার এই অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প তুলে ধরব।

রশিদ খানের জন্ম ১৯৯৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের নাঙ্গারহারে। আফগান যুদ্ধের কারণে তার পরিবার কিছু সময়ের জন্য পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। সেখানে তার ভাইদের সাথে ক্রিকেট খেলে তার এই খেলার প্রতি ভালোবাসা গড়ে ওঠে। পাকিস্তানি অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার এবি ডি ভিলিয়ার্স তার প্রথম দিকের প্রেরণা ছিলেন।

শৈশবে রশিদ প্রথমে ব্যাটার হিসেবে দক্ষতা দেখালেও পরে লেগ-স্পিন বোলিংয়ে মনোনিবেশ করেন। তার বোলিং অ্যাকশন শহীদ আফ্রিদির থেকে অনুপ্রাণিত। ২০১৪ সালে পাকিস্তানে আফগান দলের সফরে তিনি পেশোয়ারে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। এই পারফরম্যান্স তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা খুলে দেয়।

২০১৫ সালে রশিদ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওডিআই এবং টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকে অভিষেক করেন। ২০১৭ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ২ ওভারে ৫ উইকেট নিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন, যা একজন আফগান বোলারের সেরা বোলিং ফিগার। এই পারফরম্যান্স তাকে বিশ্ব ক্রিকেটে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে যায়।

রশিদের বোলিং শৈলী অনন্য। তিনি ঐতিহ্যবাহী লেগ-স্পিনারদের মতো বেশি ঘূর্ণনের উপর নির্ভর করেন না। তার দ্রুত গতি এবং প্রতারণামূলক গুগলি ব্যাটারদের জন্য মারাত্মক। তার নিখুঁত লাইন-লেংথ এবং বৈচিত্র্য তাকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ টি-টোয়েন্টি বোলার।

২০১৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে রশিদ ৭ উইকেট নিয়ে ওডিআই ক্রিকেটে ইতিহাস গড়েন। মাত্র ১৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে তিনি ওডিআইয়ের চতুর্থ সেরা বোলিং ফিগার অর্জন করেন। এই পারফরম্যান্স তাকে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ এবং ২০১৭ সালে আইসিসি অ্যাসোসিয়েট ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার পুরস্কার এনে দেয়।

২০১৮ সালে রশিদ ওডিআই এবং টি-টোয়েন্টি বোলারদের আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে পৌঁছান, যা তাকে এই কৃতিত্ব অর্জনকারী সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার করে। মাত্র ৪৪ ম্যাচে ১০০ ওডিআই উইকেট নিয়ে তিনি দ্রুততম বোলার হিসেবে রেকর্ড গড়েন। ২০১৮ সালের এশিয়া কাপে তার পারফরম্যান্স তাকে আইসিসি অলরাউন্ডার র‍্যাঙ্কিংয়েও শীর্ষে নিয়ে যায়।

রশিদ ২০১৮ সালে ভারতের বিপক্ষে আফগানিস্তানের প্রথম টেস্ট ম্যাচে অভিষেক করেন। তিনি প্রথম ইনিংসে ১৫৪ রান দিয়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বোলিং ফিগার রেকর্ড করেন। তবে, ২০১৯ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি প্রথম টেস্ট ফাইভ-উইকেট হল নেন। ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১১ উইকেট নিয়ে তিনি আফগানিস্তানের টেস্ট জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০১৯ সালে, মাত্র ২০ বছর ৩৫০ দিন বয়সে, রশিদ বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেন, যা তাকে সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট অধিনায়ক করে। এই ম্যাচে তিনি ৫০ রান করেন এবং ১১ উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানকে ২২৪ রানে জয় এনে দেন। এই কৃতিত্ব তাকে প্রথম অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট ম্যাচে ফিফটি এবং ১০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়ে।

আইপিএল-এ রশিদ ২০১৭ সালে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে অভিষেক করেন। ৪ কোটি রুপিতে কেনা তিনি প্রথম মৌসুমে ১৪ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হন। ২০১৮ সালে তিনি দলকে ফাইনালে নিয়ে যান। ২০২২ সালে গুজরাট টাইটান্সে যোগ দেন এবং প্রথম মৌসুমেই শিরোপা জয়ে ১৯ উইকেট নেন।

২০২৩ সালের আইপিএল-এ রশিদ কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক নেন, যা তাকে আইপিএল ইতিহাসের চতুর্থ বোলার করে। তিনি ২৭ উইকেট নিয়ে মৌসুম শেষ করেন এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে ৩২ বলে ৭৯* রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন। ২০২৫ সালে গুজরাট তাকে ধরে রাখে, তবে তার পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণ করেনি।

২০২৩ সালের ওডিআই বিশ্বকাপে রশিদ আফগানিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইংল্যান্ড, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ে তার অবদান ছিল অমূল্য। তবে, বিশ্বকাপের পর তিনি পিঠের অস্ত্রোপচারের কারণে চার মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনি আফগানিস্তানকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান, যা তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব।

রশিদের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার অতুলনীয়। ২০২৫ সালের আগে তিনি ৬৩৪ উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তার গড় ১৩-এর নিচে এবং ইকোনমি রেট ৭-এর নিচে। ২০২০ সালে তিনি আইসিসি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার অফ দ্য ডেকেড পুরস্কার জিতেন। তিনি আইসিসি টি-টোয়েন্টি দশকের দলেও স্থান পান।

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে রশিদ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি গুজরাট টাইটান্স, অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স, লাহোর কালান্দার্স এবং এমআই নিউ ইয়র্কের হয়ে খেলেন। ২০১৭ সালে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সের হয়ে তিনি প্রথম হ্যাটট্রিক নেন। ২০১৮ সালে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের সাথে বিগ ব্যাশ লিগ জয় করেন। তার ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৮ সালে রশিদ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ কোয়ালিফায়ারে আফগানিস্তানের অধিনায়কত্ব করেন। ১৯ বছর ১৬৫ দিন বয়সে তিনি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অধিনায়কত্ব করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হন। ২০২১ সালে তিনি আফগানিস্তানের টি-টোয়েন্টি দলের পূর্ণাঙ্গ অধিনায়ক হন এবং ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান।

রশিদের টেস্ট ক্যারিয়ারে তিনি ৫ ম্যাচে ৩৪ উইকেট নিয়েছেন, গড় ২২.৩৫। তার সেরা পারফরম্যান্স জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০২১ সালে, যেখানে তিনি ১১ উইকেট নেন। তবে, পিঠের ইনজুরির কারণে তিনি ২০২৪ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিরতি নেন। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড এবং দলের ম্যানেজমেন্ট তার ফিটনেসের উপর নজর রাখছে।

২০২৫ সালে রশিদ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আফগানিস্তানের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বেন ডাকেটের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে তিনি দলের জয়ে অবদান রাখেন। তবে, দল ফাইনালে পৌঁছালেও ভারতের কাছে হারে। তার বোলিং এবং নেতৃত্ব টুর্নামেন্টে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

রশিদের ব্যক্তিগত জীবনও তার ক্রিকেটের মতোই আলোচিত। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর তিনি কাবুলে বিয়ে করেন, যেখানে তার তিন ভাইও একই দিনে বিয়ে করেন। তিনি জালালাবাদে একটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক এবং অস্ট্রেলিয়ার বুশফায়ার ত্রাণের জন্য তার গাড়ি নিলামে তুলে দান করেন। তার নেট ওয়ার্থ প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।

রশিদের পুরস্কারের তালিকা দীর্ঘ। ২০১৮ সালে তিনি আইসিসি টি-টোয়েন্টি দলের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে তিনি আইসিসি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার অফ দ্য ডেকেড পুরস্কার জিতেন। তার ৭০০ টি-টোয়েন্টি উইকেটের মাইলফলক তাকে ক্রিকেট ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দেয়। তিনি আফগানিস্তানের ক্রিকেটের প্রতিনিধি।

 

Walton Ads