রোজা চলে গেল আমরা কতটা আত্মশুদ্ধি অর্জন করলাম

আমরা যেমন আমাদের দিনের, সময়ের, টাকা পয়সা, ধনসম্পদের হিসেব নিজেরা করি তেমনি একমাস সিয়াম সাধনার পর এ রোজা আমাদের কতটা আত্মশুদ্ধি এনে দিল তা পরখ করা উচিত নয় কি। বিশেষ করে পাপ কাজের পক্ষে শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে আমরা রোজা পালনের মাধ্যমে যে শক্তি অর্জন করলাম তা অবশ্যই আমাদেরকে পথ দেখাতে সাহায্য করবে। কোনো পাপকে দৃশ্যত ছোট মনে হলেও তা হেলায় ফেলায় কম গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।

কারণ, তা আল্লাহ দেখছেন। অনেক মানুষ মহান আল্লাহ মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বকে সব সময় হৃদয় দিয়ে অনুভব করে না বলে পাপে জড়িয়ে পড়ে। আমরা নামাজ পড়ার সময় বলছি আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ নামাজ পড়ার পরই আবারও পাপে জড়িত হই! অর্থাৎ আল্লাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মুখে স্বীকার করা সত্ত্বেও কাজের বেলায় তার শ্রেষ্ঠত্বকে মানার পরীক্ষায় ফেল করছি। অর্থাৎ আল্লাহ তো আমাদের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটিই আশা করেন। রোজা কুপ্রবৃত্তিকে দমানোর অনুশীলনের মাধ্যমে আমাকে সে শক্তি এনে দিলে তার অনুশীলন শুরু করা জরুরি। ঈমান তো কেবল মৌখিক স্বীকৃতি নয়। কাজেও তা প্রমাণ করতে হয়। তাই সবক্ষেত্রে মহান আল্লাহর আদেশকে শিরোধার্য করতে হবে। এগুলো নিয়মিত নিরন্তর চর্চার ব্যাপার। 

আত্মশুদ্ধির অনন্য পথ হল রোজা রাখা। রোজা রাখার অর্থ কেবলমাত্র খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকা নয়, বরং মানুষকে পাপ থেকেও বিরত থাকতে হবে। যেভাবে পানাহার থেকে বিরত ছিলাম রোজার একমাস, ঠিক একইভাবে চোখ, কান এবং জিহবাকেও সীমালঙ্ঘন করা থেকে সংযত করে যাব বাকিটা জীবন। এখন থেকে তোমাদের জিহ্বাকে অপরের সমালোচনা, গিবত, মন্দ কথা এবং মিথ্যা থেকে দূরে রাখার চর্চা করতে হবে। হিংসা-জিঘাংসা এবং অন্যান্য শয়তানী কার্যকলাপ নিজের অন্তর থেকে বের করে দিতে হবে। আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার শক্তি অর্জন করতে হবে। প্রতারণা না করে নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে। তা অফিস হোক আরা বাসায় কিংবা ঘরে বাইরে সর্বত্রই। 

রমজান মাসের শেষে আমাদের কথা ও কর্মে কোনো পরিবর্তন না আসলে বুঝতে হবে এই রোজা আমাদের জীবনে কোনো দাগ কাটেনি। আচার-আচরণ যদি রোজার মাসের আগের দিনগুলোর থেকে ভিন্ন না হয়, তাহলে এটা সুস্পষ্ট যে রোজার প্রকৃত তাৎপর্য আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি। আমাদের রোজা ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিক ব্যাপার মাত্র। ক্ষুৎ ও পিপাসা নিয়ে সময় কাটানোই কি কেবল রোজার মহৎ উদ্দেশ্য হতে পারে, কখনো নয়। 

এই মহান মাস, যে মাসে আমাদের ঐশী আহবানে নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, এসময়ে যদি আমরা আল্লাহর ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে না পারি, কিংবা অন্ততঃ নিজের ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে না পারি, নিজের প্রকৃত স্বরুপ চিনতে না পার তাহলে বুঝে নিতে হবে আল্লাহর দেয়া এই রোজায় ঠিকভাবে অংশগ্রহণ করিনি। 

কারণ পবিত্র মাস, রমজান যা কিনা ‘আল্লাহর মাস’, যে সময়ে খোদার বান্দাদের জন্যে ঐশী দয়ার দরজা খুলে গিয়েছিল। এ সময়ে শয়তানদেরকে শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছিল, আর আমরা যদি এসময় নিজেদের ভুল ত্রুটি শুধরে নিজেদের সংস্কার করতে না পারি, আত্মশুদ্ধি করতে না পারি, নিজের খেয়াল খুশি বা নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, নিজের স্বার্থপর কামনা-বাসনাকে দমন করতে না পারি, এই দুনিয়া ও বস্তুজগতের মায়া ত্যাগ না করে মানুষের জন্যে মানুষ হয়ে না দাঁড়াই, তাহলে রোজার মাস শেষ হওয়ার পরে এগুলো অর্জন করা তোমাদের পক্ষে খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। 

এমনটা যেনো না হয় যে, রমজান মাস আসার আগেই শয়তান আমাদের এমনভাবে আক্রান্ত করে ফেলেছে যে, যখন শয়তানকে শিকলবন্দী করে রাখা হয়েছে, তখন আমরা নিজে থেকেই নানারকম পাপকাজ ও ইসলামবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে থেকেছি, আর রোজা না রেখেও ইফতার ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় মেতে থেকেছি আর রোজার পর নিজেদের পাপ ও খেয়াল খুশি মত চলা ফের আগের মতই অনুসরণ করতে শুরু করেছি। তাহলে খোদা থেকে দূরে সরে যাবার কারণে এবং বড় বড় গুনাহের কারণে সীমালঙ্ঘনকারী পাপী মানুষ হিসেবে অজ্ঞতা ও অন্ধকারের এতই অতলে নেমে গিয়েছি যে এই রোজায় আমরা আমাদের শুধরে নিতে পারিনি। তাহলে তো শয়তানের আর আমাদেরকে প্ররোচিত করার প্রয়োজন হয় না, বরং আমরা মানুষ হয়ে নিজেই শয়তানের পথে মানুষকে বিভ্রান্ত করছি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা কর। অনেকেই মনে করেন এখানে ধৈর্য বলতে রোজা বা সংযমকে বোঝানো হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, রোজা আত্মরক্ষার ঢালস্বরূপ।

Walton Ads