আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “ওভার নাইট আমি ভারতের দালাল হয়ে গেছি। গত ১৫ বছর আমি ছিলাম পাকিস্তানের দালাল, এখন ভারতের।” বিভিন্ন সময় তাকে নিয়ে ছড়ানো অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ে তিনি এভাবেই নিজের হতাশা তুলে ধরেন।

শনিবার ১০ জানুয়ারি দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ সিজিএস আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক পলিসি ডায়ালগে এসব কথা বলেন তিনি।

আসিফ নজরুল বলেন, “আমি ১৫ বছর ছিলাম পাকিস্তানের দালাল, আর ওভার নাইট আমি ভারতের দালাল হয়ে গেছি। আমার নাকি আমেরিকায় বাড়ি আছে, পরিবার অলরেডি আমেরিকায় চলে গেছে—এই সব মিথ্যা ছড়ানো হয়েছে। ছয় মাস আগে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম, কেউ প্রমাণ করতে পারেনি। যারা এসব মিথ্যা আর বদমাইশি কথা ছড়িয়েছে, তাদের কাউকে কিছু বলা হয়েছে? এর চেয়ে বড় সাইবার বুলিং আর কী হতে পারে?” তিনি বলেন, সততাই যার জীবনের সবচেয়ে বড় অহংকার, তার বিরুদ্ধে এমন ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে।

সরকারি কাজের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধরুন সরকার ১০টি বিষয়ের মধ্যে ৪টি কাজ করতে পেরেছে, তাহলে অন্তত সেই ৪টিকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এরপর বাকি ৬টি কেন করা যায়নি, সেটার কঠোর সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু এমনভাবে বলা যে কিছুই হয়নি—এটা কষ্ট দেয়। তখন মনে হয়, সমালোচনা কি সত্যিই সততার জায়গা থেকে, নাকি সেটা পেশা বা আত্মতৃপ্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

জুলাইয়ের মামলাগুলোতে জামিন দেওয়া নিয়ে নিজের দায় নেই দাবি করে আইন উপদেষ্টা বলেন, জুলাইয়ের ঘটনায় যত জামিন হয়েছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই হয়েছে হাইকোর্ট থেকে। হাইকোর্ট যে জামিন দেয়, সেখানে কোনো ভুল থাকলে সেটা বিচারকের বিষয়। অনেক বিচারকই আগের আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ও প্রধান বিচারপতির। এখানে আইনমন্ত্রীর কিছু করার নেই। “আমি কি হাইকোর্টের বিচারককে সরাতে পারি?”—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টের বিচারক যদি অন্যায়ভাবে জামিন দেন, তার দায় সেই বিচারকের এবং তার নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান বিচারপতির। অথচ সব জামিনের দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সত্যিই যদি এসব বন্ধ করতে চান, তাহলে যারা দায়ী, তাদের প্রশ্ন করা উচিত।

আসিফ নজরুল অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তার ওপর দায় চাপানো হয়। তিনি বলেন, “একটা কারণ হলো ভিউ বাড়ে, ব্যবসা ভালো হয়, মনিটাইজেশন হয়। আসিফ নজরুলের নামে গালি দিলে একটু টাকা আসে। আরেকটা কারণ, বিশেষ একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন সহজ হয় যদি আমাকে দুর্বল করা যায়।”

সবশেষে সবাইকে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মেও আত্মসমালোচনাকে বড় গুণ হিসেবে দেখা হয়। আসুন আমরা সবাই আত্মসমালোচনা করি, একে অপরের মতামত, সীমাবদ্ধতা আর শক্তির জায়গা বুঝতে চেষ্টা করি। তাহলে ধীরে ধীরে সংস্কারের পথে এগোনো সম্ভব হবে।

বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি বলেন, অনেকেই বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু নিজেরা কি আদৌ সংস্কার হয়েছেন? নিজেদের চিন্তা, সততা ও প্রতিষ্ঠান—সবকিছুকেই সংস্কার করতে হবে। এনজিও, পত্রিকা অফিস, রাজনৈতিক দল—সবারই আত্মসমালোচনা জরুরি। আমরা যদি সৎ হই এবং নিয়ত পরিষ্কার রাখি, তাহলে পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই দেশ অনেক ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারে।

 

news