ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও আভিজাত্যপূর্ণ ছবিগুলোর একটি ‘দেবদাস’। সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত এই সিনেমায় দেবদাস চরিত্রে শাহরুখ খান, পার্বতী বা পারু চরিত্রে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন এবং চন্দ্রমুখী চরিত্রে মাধুরী দীক্ষিত অভিনয় করেন। তিন তারকার অসাধারণ অভিনয় আর বানসালির চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল আজও দর্শককে মুগ্ধ করে।

২৪ বছর আগে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা সম্প্রতি আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরেছে। অবাক করার বিষয়, নতুন প্রজন্ম—জেন-জি দর্শকরাও দেবদাস, পারু ও চন্দ্রমুখীর আবেগঘন রসায়নে মুগ্ধ। ফলে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে ‘দেবদাস’।

পারুর সেই কাচের ঘর—এক অনন্য সৃষ্টি

বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে নজরকাড়া সেটগুলোর একটি ছিল পারুর কাচের ঘর। এই সেট বানাতে ব্যবহার করা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার রঙিন কাচের টুকরো। সেটটি নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় ৯ মাস। শিল্প নির্দেশক নিতিন দেশাই এর ডিজাইন করেন।

তবে কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। স্টুডিওর তীব্র আলোর তাপে কাচ বারবার ভেঙে যেত। ফলে নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজন হতো। এত কষ্টের ফলেই তৈরি হয়েছিল সেই রাজকীয় ভিজ্যুয়াল।

আলোকসজ্জায় রেকর্ড আয়োজন

‘দেবদাস’-এর সেটে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন মোমবাতির সমান আলো! এই বিশাল আয়োজন চালাতে ৪২টি জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। এত শক্তিশালী আলোর কারণে আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট পর্যন্ত দেখা দিয়েছিল।

এ থেকেই বোঝা যায়, সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত করতে কতটা শ্রম ও পরিকল্পনা ছিল।

পারুর ৬০০-র বেশি শাড়ি!

ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন পুরো সিনেমাজুড়ে ৬ শতাধিক শাড়ি পরেছিলেন। কলকাতা থেকে আনা ও বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই শাড়িগুলো ছবির আভিজাত্য আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক শাড়ির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৯ মিটার।

শেষ দৃশ্যে ঐশ্বরিয়া যে শাড়িটি পরেছিলেন, তার দৈর্ঘ্য ছিল ১৩ মিটার। দুই থেকে তিনটি সুতি শাড়ি জুড়ে এটি তৈরি করেন ফ্যাশন ডিজাইনার নীতা লুল্লা।

চন্দ্রমুখীর ৩০ কেজির পোশাক

‘কাহে ছেড় মোহে’ গানে মাধুরী দীক্ষিত যে পোশাক পরেছিলেন, তার ওজন ছিল প্রায় ৩০ কেজি! বানসালির সিনেমায় ব্যবহৃত ভারী শাড়িগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই পোশাকই সিনেমার রাজকীয়তা ও সূক্ষ্ম কারিগরির আরেকটি দৃষ্টান্ত।

শুটিংয়ে ঐশ্বরিয়ার কান থেকে রক্ত!

‘দোলা রে দোলা’ গানে ঐশ্বরিয়া যে ভারী দুল পরেছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে শুটিং চলাকালে সেই দুলের কারণে তার কান থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়। অবাক করার বিষয়, শুটিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ বিষয়টি টের পাননি।

বিশাল টিম, রাজকীয় আয়োজন

‘দেবদাস’ নির্মাণে কাজ করেছিলেন ৭ শতাধিক লাইটম্যান। বড় বাজেটের সেট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্বেও তারা ছিলেন। এই বিশাল টিমও সিনেমাটির মহিমা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

সাফল্যের মুকুটে রত্ন

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর প্রেমগাথা অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা ২০০২ সালে মুক্তি পায়। মুক্তির পর দর্শক হৃদয়ে ঝড় তোলে ‘দেবদাস’।

কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে ছবিটি। এই সিনেমার মাধ্যমেই ঐশ্বরিয়া রাই প্রথমবার কানের লালগালিচায় হাঁটেন। ২০০২ সালে এটি পাঁচটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ১০টি শাখায় ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়।

দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ‘দেবদাস’ যেন আজও একইভাবে অমলিন—ভিজ্যুয়াল, আবেগ আর রাজকীয়তার অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে।

 

news