মাত্র সাত-আট বছরের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে নীরব হলেও অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসে গেছে। ব্যাপারটা কী জানেন? এখন আর দলের বড় নেতারা সিদ্ধান্ত নেন না। পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দুটি ‘বহিরাগত’ সংস্থার হাতে।
একটা তৃণমূল কংগ্রেসের ‘আই-প্যাক’ (ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি), আর অন্যটা বিজেপির ‘আইটি সেল’। আর এই দুই সংস্থাই লিখে দিচ্ছে কে কোথায় প্রচার করবেন, কী বলবেন, আর কাদের প্রার্থী করা হবে!
পাল্টে যাওয়া এই রাজনীতির মজার গল্পটা শুরু করা যাক তৃণমূল থেকে। বছর সাতেক আগে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে দারুণ ভালো ফল করেছিল। তখনই তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জী ডেকে আনেন বিখ্যাত নির্বাচনী কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের হাতে গড়া ‘আই-প্যাক’কে। প্রশান্ত কিশোর অবশ্য এখন রাজনীতিতে, কিন্তু তাঁর তৈরি এই সংস্থা এখন তৃণমূলের মেরুদণ্ড।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জীর দল বিপুল জয় পায়। রাজনৈতিক মহলে অনেকেই বলেন, এই সাফল্যের মূল মন্ত্র দিয়েছিল আই-প্যাক। বিষয়টা যত সত্যি হোক না কেন, এখন জেলায় জেলায়, এমনকি গ্রামের স্তরেও তৃণমূলের শেষ কথা বলেন দলের নেতারা না, বলেন আই-প্যাকের পেশাদার কর্মীরা।
উত্তরবঙ্গের এক তৃণমূল বিধায়ক তো মুখ খুলেই বলেছেন, ‘আই-প্যাকের নির্দেশ ছাড়া তৃণমূলের ভেতরে এখন একটা গাছের পাতাও নড়ে না!’ প্রার্থী বাছাই থেকে প্রচারের নিয়মকানুন— সবকিছুই এখন ওদের ইশারায় চলে।
আর এই প্রভাব কতটা গভীর, তা বোঝা গেল গত জানুয়ারিতে। কলকাতায় আই-প্যাকের অফিস আর সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট (ইডি)। তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নিজেই ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন তল্লাশি ঠেকাতে। দলের শীর্ষ নেত্রীর এমন তৎপরতা থেকেই বোঝা যায়, আই-প্যাকের গুরুত্ব কতটা!
অন্যদিকে বিজেপির গল্পটাও কম জমজমাট নয়। পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় নেতাদের ওপর ভরসা না রেখে দল ভোটের কৌশল ঠিক করার দায়িত্ব দিয়েছে বাইরের আসা নেতাদের। এঁদের প্রধান মুখ অমিত মালভিয়া। তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা, আবার একই সঙ্গে দলের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান। এই বিভাগটিকেই আমরা সাধারণ ভাষায় বলি ‘আইটি সেল’।
আইটি সেলের সুনাম আর দুর্নামের পাল্লা খুব ভারি। আর সেই আইটি সেলই এখন কলকাতার বুকে বসে বিজেপির হয়ে পুরো নির্বাচনী কৌশল তৈরি করে দিচ্ছে। এমনকি সেটুকুও ঠিক করে দেয়— নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে এসে ঝালমুড়ি খাবেন নাকি গঙ্গায় নৌবিহার করবেন! অমিত শাহ কোন দিন কোথায় কী বলবেন, স্মৃতি ইরানি মাছ খাওয়া নিয়ে কী কমেন্ট করবেন, না যোগী আদিত্যনাথের সভায় বুলডোজার নিয়ে কবে কী বলবেন— সব খুঁটিনাটি ঠিক করে দেয় আইটি সেলের পেশাদার টিম।
কলকাতার নিউটাউন রাজারহাটে আকাশচুম্বী হোটেল দ্য ওয়েস্টিনের তিরিশ তলায় একাধিক স্যুইট ভাড়া নিয়ে বসেছে অমিত মালভিয়ার আইটি সেল। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের প্রার্থীদের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়— কে কী বলবেন, কোথায় কাকে প্রচারে পাঠালে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পাঠাবেন নাকি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী— সব ঠিক হয় সেখান থেকেই।
ফলে আই-প্যাক আর আইটি সেলের এই কৌশলের লড়াইয়ে মমতা-শাহদের মতো বড় নেতারাও যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। তৃণমূলের এক বিধায়ক নিজেই বিবিসিকে বলেছেন, ‘ওরা পুরো চিত্রনাট্য লিখে পাঠিয়ে দেয়। আমাদের বেশি মাথা ঘামাতে হয় না। ওই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী যা যা করার তাই করেই যাচ্ছি আমরা!’
শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ভোটের লড়াই এখন আর দলীয় নেতাদের লড়াই নয়, বরং আই-প্যাক আর আইটি সেলের এই দুই ‘বহিরাগত’ সংস্থার চালাকি আর পাল্টা চালাকির খেলা!
