ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চল ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে এক রেকর্ড গরমের ঢেউ মোকাবেলা করছে, যেখানে অনেক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। এই অতিরিক্ত গরম শুধু পরিবেশকেই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতিকেও মারাত্মক প্রভাবিত করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেহাল অর্থনীতিতে এই গরম কোটি কোটি ইউরোর ক্ষতি করছে, যা শুধু তাপমাত্রার মাত্রা দিয়েই বোঝা যায় না, বরং কৃষি ক্ষেত্রের শুষ্কতা থেকে শুরু করে শিল্প কারখানাগুলোর অচল অবস্থা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই গরমের ঢেউ এখন আর সাময়িক নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জার্মান ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি আলিয়াঞ্জ ট্রেড জানাচ্ছে, ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে প্রতিটি অতিরিক্ত ডিগ্রি শ্রমিক উৎপাদনশীলতা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১.৩০ ডলার কমিয়ে দেয়, যা গড়ে ৩ শতাংশের মতো।
কৃষি, নির্মাণ ও পরিবহন খাত এই গরমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্রান্সের প্রধান নিয়োগকর্তা সংস্থা মেদেফের প্রধান প্যাট্রিক মার্টিন বলেন, “ফ্রান্স এখন ধীরগতিতে কাজ করছে।” ING ব্যাংকের গ্লোবাল হেড অব ম্যাক্রো রিসার্চ কার্সটেন ব্রজেস্কি বলেন, “তাপমাত্রা এখন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির একটি পূর্বাভাসক সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে জার্মানি গরমজনিত অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে ইউরোপে তৃতীয় স্থানে থাকতে পারে, কারণ এখানে অবকাঠামো ও শিল্পক্ষেত্রগুলো ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য তৈরি। গরমের প্রভাবে ইউরোপের পরিবহন অবকাঠামোও ভেঙে পড়ছে।
রাস্তা ফেটে যাচ্ছে, রেললাইন বিকৃত হচ্ছে এবং ট্রাম পরিষেবা বন্ধ হচ্ছে। জার্মানির বার্লিন ও হামবার্গের প্রধান সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, লেইপজিগে ট্রাম সার্ভিস স্থগিত হয়েছে। ফ্রান্সের SNCF প্যারিসের আশপাশের ট্রেন পরিষেবা সীমিত করেছে এবং ইউরোস্টার গরমের কারণে গতি কমিয়েছে।
রাইন নদীর পানি কমে যাওয়ায় পণ্যবাহী জাহাজের ধারণক্ষমতা ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পরিবহন খরচ বাড়িয়েছে এবং জ্বালানি, রাসায়নিক ও কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত করেছে। বিদ্যুৎ খাতে চরম গরমের প্রভাব প্রকট। বেলজিয়ামে বিদ্যুতের দাম প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় রেকর্ড ১০৩৮ ইউরোতে পৌঁছেছে, জার্মানিতে ৭৪৭ ইউরো।
গরমের কারণে সৌর প্যানেল ও গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্ষমতা কমেছে, এবং নদীর পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কিছু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন কমিয়েছে বা বন্ধ করেছে। ফ্রান্সের EDF এবং সুইজারল্যান্ডের Axpo এই কারণে তাদের কেন্দ্রগুলো সাময়িক বন্ধ করেছে। শক্তি সংকটে ইউরোপের নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্র থেকে LNG আমদানি বাড়ায়, যা ২০২৬ সালে মোট আমদানি ৬৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
তবে কিছু রাজনীতিবিদ ইউরোপকে কম খরচে রাশিয়ার গ্যাস কেনার মাধ্যমে চাপ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। রাশিয়া এখন ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস সরবরাহকারী, যার পরিমাণ ২২.১ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস, যা মোট চাহিদার ১২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যও গরমের প্রভাবে বাড়ছে।
বার্ষিক কৃষিক্ষেত্রের শুষ্কতা ও গরম ধানের ফসল ও অন্যান্য শস্যের উৎপাদন কমিয়েছে, যা খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলছে। ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের হিসাব মতে, ২০২২ সালের খরা খাদ্য মূল্যস্ফীতি ০.৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। আরেকটি তীব্র গরমের ঢেউ আবারও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অবশেষে, এই গরমের অর্থনৈতিক প্রভাবের বোঝা ইউরোপীয় ঘরবাড়িতে পড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী, বড় কোনো গরমের ঢেউয়ের বছর পরবর্তী বছরেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় ১ শতাংশ কমে যায় এবং দ্বিতীয় বছরে এই ক্ষতি ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও উৎপাদনের ব্যাহত ধারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করা যায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়। কার্সটেন ব্রজেস্কির কথায়, “গরমের ঢেউ এখন শুধু আবহাওয়ার ঘটনা নয়, এটি ইউরোপের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি।”