ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কের আঙ্কারায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার লাইসেন্স প্রদান করবে । এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের আকুতি পূরণ করলেও, তা বাস্তবায়নে সময় ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ উভয়ই বিদ্যমান ।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প জেলেনস্কির উদ্দেশে বলেন, "আমরা তোমাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দিতে যাচ্ছি" । তিনি এই অস্ত্রকে প্রতিরক্ষামূলক আখ্যা দিয়ে আক্রমণাত্মক অস্ত্রের চেয়ে এটিকে বেশি পছন্দ করার কথাও জানান । ট্রাম্পের আশাবাদ, মার্কিন ব্যাখ্যা পেলে ইউক্রেন অত্যন্ত দ্রুত এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। তবে এ বিষয়ে তারা প্রস্তুতকারক সংস্থা লকহিড মার্টিন ও রেথিয়নকে এখনও অবহিত করেননি, যদিও তিনি দাবি করেন যে এই বিষয়টি "ঠিকঠাক মতো কাজ করবে" ।
এই ঘোষণার পটভূমিতে রয়েছে ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জটিল সংকট। রাশিয়া সম্প্রতি ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে, যেখানে গত সপ্তাহে কিয়েভে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয়েছে । ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র ঘাটতি রয়েছে । গত রবিবার রুশ হামলায় ২৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কোনোটিই ভূপাতিত করা সম্ভব হয়নি বলে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে । জেলেনস্কি সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, পশ্চিমা অংশীদারদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি এখনও পায়নি কিয়েভ ।
তবে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক এই ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সংখ্যা মাত্র ৬০০টি । ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন মজুদের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের জন্য এই অস্ত্র ধরে রাখতে আগ্রহী । অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে রুশ সমালোচনা আসতে বাধ্য। এরই মধ্যে রাশিয়া সতর্ক করে দিয়েছে যে, ইউক্রেনে কোনো অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র তাদের জন্য উচ্চ-মূল্যের লক্ষ্যবস্তু । সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা কিয়েভে একটি স্যামসাং উৎপাদন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছিল ।
এই পরিস্থিতিতে কিয়েভের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামরিক বিশ্লেষক ইভান স্টুপাক জানান, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তার দিক থেকে ইউক্রেনের মাটিতে এই অত্যাধুনিক অস্ত্র উৎপাদন সম্ভব নয়, বরং তা তত্ত্বাবধানে ইউরোপীয় মাটিতেই করা হতে পারে । যদিও ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করতে কমপক্ষে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টার জন্য একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতে কেবল অস্ত্র সরবরাহের জটিলতা কমানোই নয়, বরং ইউক্রেনকে দীর্ঘমেয়াদে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে, যা রাশিয়ার সাথে চলমান সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।