যুদ্ধে আমি সব হারিয়েছি: ফিলিস্তিনি ফুটবলার

ফিলিস্তিন জাতীয় দলের ফুটবলার মোহাম্মেদ বালাহ। গাজার আল সাদাকা ফুটবল ক্লাবে ফিরেছেন তিন মাসও হয়নি। শৈশবের ক্লাবে ফিরে খুব খুশি হয়েছিলেন বালাহ। গাজা প্রিমিয়ার লিগে নিয়মিত পাচ্ছিলেন গোলের দেখাও। সুন্দর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রেমিকাকে বিয়েও করেন তিনি। কিন্তু তার আনন্দের দিনগুলো খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যায়। নেমে আসে বিভীষিকা।

এর মধ্যেই গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণে অতর্কিত হামলা চালায় গাজার সশস্ত্র নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী হামাস। হামলায় কয়েকশ ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হন এবং অনেককে বন্দি করে নিয়ে যায় হামাস। এর জবাবে গাজা উপত্যকায় অনবরত বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। পাশাপাশি ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চালায় স্থল অভিযানও। - বাংলানিউজ

যে হামলায় এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি গাজাবাসী মারা গেছেন। যুদ্ধে গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে বালাহর ফুটবল ক্যারিয়ারও।

যুদ্ধ শুরুর আগে লিগের পঞ্চম ম্যাচ ডে’তে খাদামাত আল-শাতির বিপক্ষে আল সাদাকার ম্যাচে ইনজুরিতে পড়েন বালাহ। ফলে মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। তবে ফিট হয়ে অক্টোবরেই এএফসি এশিয়ান কাপ দিয়ে ফিলিস্তিন দলে ফেরার কথা ছিল ৩০ বছর বয়সী এই ফুটবলারের। কিন্তু যুদ্ধ সব ভণ্ডুল করে দেয়।

বালাহর জম্ন ও বেড়ে ওঠা উত্তর গাজার শাতি শরণার্থী ক্যাম্পে। মাত্র ৬ বছর বয়সেই ফুটবলের সঙ্গে সংখ্যতা শুরু হয় তার এবং চার বছর পর আল সাদাকার অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন তিনি। গাজা-ভিত্তিক এই ক্লাবে নিজের প্রথম মেয়াদে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৭০ ম্যাচ খেলে ৪২ গোল করেন ফিলিস্তিনি এই ফরোয়ার্ড। ২০১৬-১৭ মৌসুমে ক্লাবটি লিগ শিরোপা জিতে নেয় এবং মৌসুমের সেরা খেলোয়াড় হন বালাহ।

গাজার অধিকাংশ খেলোয়াড়দের মতো বালাহও বাইরের ক্লাবগুলোতে খেলতে যান। আল সাদাকা ছেড়ে তিনি জর্ডান, ওমান ও মিশরের ক্লাবে খেলেন। সব জায়গায় ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জোরে তিনি জায়গা করে নেন ফিলিস্তিনের জাতীয় দলে। এখন পর্যন্ত দেশের জার্সিতে ৯ ম্যাচে ১ গোল করেছেন তিনি। এখন আল সাদাকার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় তিনি, গায়ে তুলেছেন ১০ নম্বর জার্সি। এই ক্লাবে প্রত্যাবর্তন করার পর প্রথম ম্যাচেই জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি। যদিও যুদ্ধে ক্লাবটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে।

কিন্তু যুদ্ধে বিধ্বস্ত গাজায় এখন ফুটবল খেলা অকল্পনীয় ব্যাপার। সবধরনের ক্রীড়া টুর্নামেন্ট বাতিল হয়ে গেছে এবং অনেক খেলোয়াড় প্রাণ বাঁচাতে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। 

জাতিসংঘের হিসাব বলছে, গাজার ১৯ লাখ মানুষ- মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ ভাগ- বাস্তুহারা হয়েছেন। কেউ কেউ কয়েকবার জায়গা বদল করেছেন বাঁচার জন্য। তাদের মতো বালাহ নিজেও ছুটে বেড়াচ্ছেন প্রাণ হাতে নিয়ে। এরমধ্যে এ মাসের শুরুতে গাজায় কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন এই যুদ্ধ তার জীবন ও ক্যারিয়ারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে।

৭ অক্টোবরের পর জীবল কতটা বদলে গেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বালাহ বলেন, ৭ অক্টোবরের আগে আমার জীবন ভালোবাসা ও আনন্দে পূর্ণ ছিল। (বছরের শুরুতে) আমি আমার শৈশবের ক্লাবে ফিরেছিলাম এবং বিয়েও করেছি কিন্তু এরপর গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর থেকে আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে ৬ বার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে আমাকে। যা শুরু হয়েছে যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই, উত্তর গাজা থেকে পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত।  

এখন আমরা অনেক পথ ঘুরে দক্ষিণের রাফাহ-তে এসেছি, যেখানে জরাজীর্ণ তাবুতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছি। যুদ্ধের ফাঁদে পড়া অন্য অনেক ফিলিস্তিনির মতো আমিও খাদ্য এবং খাবার পানি ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি। আমার শারীরিক ফিটনেস বড় ধাক্কা খেয়েছে। আমার ওজন কমে গেছে। খেলার উপযোগী তো দূরের কথা, আমি এমনকি কয়েক মাসে একবারও বলে কিক দেইনি ফুটবল আমার প্যাশন। আমার একমাত্র আয়ের উৎস। আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। 

আমি জানি না গাজার ফুটবল কমিউনিটি ও অবকাঠামোর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরও ফিফা কেন চুপ করে আসে। ইসরায়েল যখন আমার ক্লাব আল সাদাকা ধ্বংস করে দিল, আমি খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। তবে গত মাসে গাজার কিংবদন্তি ও আমার প্রিয় বন্ধু মোহাম্মেদ বারাকাতকে তার বাড়িতেই হত্যা করা হয়েছে, যা আমার জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। ফিফা সবসময় মানবাধিকার ও সমতা নিয়ে সোচ্চার, তাহলে গাজায় যা চলছে তা নিয়ে চুপ থাকা তো একপ্রকার দ্বিচারিতা। ইউক্রেনে হামলার কারণে রাশিয়া তড়িৎ গতিতে নিষিদ্ধ করতে পারেল, গাজার ব্যাপারে তারা চুপ কেন?

news