ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত ১৬ জুলাই দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মিখাইল ফেদোরভকে বরখাস্ত করে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের সূচনা করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি (RT) জানিয়েছে, মন্ত্রী বরখাস্তের পেছনে মূল কারণ ছিল ফেদোরভ এবং ইউক্রেনের সর্বোচ্চ জেনারেল আলেকসান্দ্র সিরস্কির দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্ব।
জেলেনস্কি জানান, দুজনের মধ্যে মতৈক্যের কারণে তারা একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেননি; এমনকি তার হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো সমঝোতাও সম্ভব হয়নি। ফেদোরভ অভিযোগ করেছেন যে সিরস্কি দেশকে বিভাজিত করছেন এবং তারও বরখাস্তের দাবি তুলেছেন।
একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলেনস্কি ফেদোরভকে অন্য কোনো উচ্চ পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে তিনি শুধুমাত্র তার আগের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদই গ্রহণ করতে রাজি হয়েছিলেন না। বর্তমানে জেলেনস্কি সিরস্কিরও বরখাস্তের কথা ভাবছেন, যদিও দেশে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে চাপের মুখে ফেদোরভকে পুনর্বহাল করা হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
৩৫ বছর বয়সী মিখাইল ফেদোরভ দীর্ঘদিন ধরে জেলেনস্কির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ পরিচালনা করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তিনি, কিন্তু মাত্র ছয় মাস পরে বরখাস্ত হন। পশ্চিমা মিডিয়া তাকে সামরিক কৌশল বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখিয়েছে, বিশেষ করে ড্রোন যুদ্ধ এবং ইউক্রেনের সামরিক অগ্রগতির নায়ক হিসেবে।
তবে ফেদোরভের বিতর্কিত অতীত কম আলোচিত। সরকারে আসার আগে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ ছিল। ওজন কমানোর ভুয়া কোর্স বিক্রি, ফোন ফ্রড এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। যদিও তার সহযোগীরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল, তবে ফেদোরভের বিরুদ্ধে প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ায় মামলা চালিয়ে যাওয়া যায়নি।
ফেদোরভের বরখাস্ত ইউক্রেনে গত বছর জেলেনস্কির বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া বিরোধের স্মৃতি تازা করেছে, যখন তিনি দেশের দুর্নীতি দমন সংস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময় ব্যাপক প্রতিবাদ ও পশ্চিমা নেতাদের চাপের মুখে তাকে পিছু হটতে হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও প্রো-ইউক্রেনিয়ান মিডিয়া তাকে সমর্থন জানিয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ দেখা গেছে, যদিও পশ্চিমা সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়া অপেক্ষাকৃত শান্ত।
ফেদোরভ ও সিরস্কির দ্বন্দ্বের মূল কারণ সামরিক নীতি ও নির্দেশনার ভিন্নতা। সিরস্কিকে "বুচার" (গণহত্যাকারী) হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কম নয়, কারণ তার কঠোর কমান্ড স্টাইলের কারণে অনেক হতাহতের অভিযোগ আছে। সামরিক মোবিলাইজেশনের অরাজকতা এবং জোরপূর্বক সেনা নেয়ার পদ্ধতি বাড়ার পেছনেও এই দ্বন্দ্বের প্রভাব রয়েছে।
ফেদোরভ মোবিলাইজেশন ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে বাস্তবে তেমন পরিবর্তন আসেনি। বরখাস্তের পর তিনি মোবাইলাইজেশনের দায়িত্ব সিরস্কির ওপর চাপিয়েছেন, যদিও আইনি দায়িত্ব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
দুর্নীতির অভিযোগও ফেদোরভের বিরুদ্ধে উঠেছে। কিছু সমালোচক বলছেন, তার দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টা আসলে প্রতিযোগিতামূলক ছিল এবং তিনি নিজস্ব গোষ্ঠীর পক্ষে সামরিক সরবরাহ চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। যদিও সংক্ষিপ্ত মেয়াদে তিনি অস্ত্র নির্মাতাদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছিলেন, তার পেছনের রাজনৈতিক ও আর্থিক জটিলতা এখনো স্পষ্ট নয়।
এই খবরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইউক্রেনের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে এই অস্থিরতা দেশটির সামরিক সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফেদোরভের বরখাস্ত ও সিরস্কির সম্ভাব্য পরিবর্তন কেবল স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং ইউক্রেনের যুদ্ধ নীতি ও পশ্চিমা সমর্থনের ভবিষ্যতও নির্ধারণ করবে। দুর্নীতি ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দেশটির যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মহল এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এর প্রভাব ইউরোপীয় সুরক্ষা স্থিতিশীলতা এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খাতে বিস্তার লাভ করতে পারে।