বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখনো এক বড় বিস্ময় হিসেবেই আলোচিত। কারণ, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে ধারণা ছিল—ক্ষমতায় আসছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সব হিসাব উল্টে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করে বিএনপি।

অনেকের মতে, ওই সময় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা খুব একটা শক্ত ছিল না। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ সময়ে দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছেড়ে যাওয়ায় বিএনপি ছিল দুর্বল অবস্থায়। বিপরীতে আওয়ামী লীগ ছিল সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী। তবু যেভাবে বিএনপি সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়েছিল, তা দেশের রাজনীতির গতিপথই বদলে দেয়—বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে এমনটাই উঠে এসেছে।

এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই দেশে কার্যত দ্বিদলীয় রাজনীতির সূচনা হয়। একই সঙ্গে পঞ্চম সংসদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি সব দলের সম্মতিতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সেটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে—এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগও প্রথম দেখা যায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।

ওই নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এক নেতা জানান, নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দেওয়া ভাষণের পরপরই তারা বুঝতে শুরু করেন—পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বিএনপির দিকে ঝুঁকছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ভাষণই নয়, আওয়ামী লীগের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং নেতাদের বক্তব্যে প্রকাশ পাওয়া দম্ভও বিএনপির জন্য সুবিধা তৈরি করে দেয়। অন্যদিকে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ অবস্থান সাধারণ মানুষের মধ্যে বিএনপির প্রতি আলাদা আস্থা তৈরি করেছিল।

ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। বিএনপি ১৪০টি আসনে জয় পেয়ে ক্ষমতায় ফেরে। আওয়ামী লীগ পায় ৮৪টি আসন এবং বিরোধী দলে বসতে হয়। জাতীয় পার্টি ৩৫টি ও জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। পরে জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করেন খালেদা জিয়া, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, নির্বাচনের আগে ঢাকায় বসে নিশ্চিতভাবে জয় কল্পনা করা কঠিন ছিল। দলীয় ভাঙন ও দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থার কারণে অনেকেই ধরেই নিয়েছিলেন—বিএনপি হয়তো বিরোধী দলেই থাকবে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, সে সময় বিএনপি নেতারাও খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ছিল সাংগঠনিকভাবে বিস্তৃত, আর এরশাদ আমলে বিএনপিকে বারবার ভাঙার চেষ্টা হয়েছিল। ফলে অনেক জায়গায় বিএনপি ঠিকমতো প্রার্থীও দিতে পারেনি।

তবে ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানান বিএনপির বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকেই তারা ‘ভালো বাতাস’ পাচ্ছিলেন। তার ভাষায়, “অনেকে বিস্ময় বললেও আমরা মাঠপর্যায়ে বুঝতে পারছিলাম পরিস্থিতি অনুকূলে আসছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভাষণ তখন বেশ সমালোচিত হয়েছিল। বিপরীতে খালেদা জিয়ার ভাষণ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। যদিও সিনিয়র সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকসহ প্রায় সবাই শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জয়ের কথাই ভাবছিলেন। সাধারণ মানুষের মনের ভেতরের অবস্থান তখন কেউ পুরোপুরি আঁচ করতে পারেননি।

বিশ্লেষকরা একমত যে, ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল দেশের প্রথম সত্যিকার অর্থে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, যা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সে সময়ের পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয়তেও এই নির্বাচন

news