রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে শুক্রবার দুপুরের সংবাদ সম্মেলনটা শুধু একটা জয়ের আনন্দ উদযাপনের ছিল না, ছিল আগামীর পথচলার রোডম্যাপ ঘোষণার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর প্রথমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান শুধু দলীয় কর্মীদের নয়, দেশের সব নাগরিকের কাছেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন।

'দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক'

তারেক রহমান তাঁর লিখিত বক্তব্যে বলেন, "একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্নমতের সবার সহযোগিতা কামনা করছি।" গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সবাই যেমন ভূমিকা রেখেছিল, এখন দুর্নীতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ আর জনগণের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বিএনপি প্রধান বলেন, "আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। সরকার ও বিরোধী দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।"

ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ক্ষত আর মেরামতের ৩১ দফা

নির্বাচনের ফলাফলকে 'গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের বিজয়' উল্লেখ করে তিনি স্বীকার করেন, চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। তারেক রহমান বলেন, "ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হচ্ছে।" এই অবস্থা মোকাবিলায় বিএনপির দেওয়া 'রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা' রূপরেখার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন তিনি।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির বেদনা

১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনের শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি যেন সবাইকে কিছুটা হলেও বিষণ্ণ করে তুলেছিল। নিজেও এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, "এমন আনন্দঘন মুহূর্তে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করেছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি কখনো মাথা নত করেননি।"

শান্তি বজায় রাখার কড়া বার্তা, আইনের শাসনের জোরদার ঘোষণা

বিজয়ের উচ্ছ্বাসে কেউ যেন শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের কোনো সুযোগ না নেয়, সে ব্যাপারে কড়া বার্তা দেন তারেক রহমান। নেতাকর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, "শত উসকানির মুখেও নেতা-কর্মীরা শান্ত থেকেছেন। যেকোনো মূল্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ বরদাশত করা হবে না।"

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে তিনি বলেন, "সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, ভিন্নমত কিংবা ভিন্নপথ—প্রতিটি নাগরিকের জন্যই আইন সমান হবে। নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে ভুল–বোঝাবুঝি হলেও তা যেন প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়।"

'জনগণকে কনভিন্স করাটাই ছিল আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং'

সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপির বিপুল জয় নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমানের উত্তর ছিল স্পষ্ট। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেতে কোনো 'ইঞ্জিনিয়ারিং' করা হয়েছিল কিনা। জবাবে তিনি হেসে বলেন, "জনগণকে কনভিন্স করাটাই আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিংটা ছিল জনগণকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা। সেটাতে আমরা সফল হয়েছি।"

Walton Ads