ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ ২০২৫–২৬ সফর এখন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। মাঠের হারই শুধু নয়, ভেতরের সমস্যাগুলো ছিল আরও গভীর—এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪–১ ব্যবধানে সিরিজ হেরে ইংল্যান্ডের প্রস্তুতি, মানসিকতা ও মাঠের বাইরের শৃঙ্খলার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।

অ্যাশেজ ২০২৫–২৬: ইংলিশ ক্রিকেটে কাঁপন ধরানো বিপর্যয়

এই সফরের আগে বড় প্রত্যাশা ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, ১৫ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অ্যাশেজ জিততে পারে বেন স্টোকসের দল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল উল্টো। পার্থ, ব্রিসবেন ও অ্যাডিলেড টেস্টে লজ্জাজনক পারফরম্যান্সের পর মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই ক্যাঙ্গারুদের হাতে অ্যাশেজ খুইয়ে বসে ইংল্যান্ড।

এই ভরাডুবির পর ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) পুরো সফর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে। যদিও অধিনায়ক বেন স্টোকস ও প্রধান কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম—দুজনই নিজেদের পদে থাকতে চান। তবে রিপোর্ট বলছে, এমন বিশৃঙ্খল সফরের পর শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস ফেরানো সহজ হবে না।

মদ আর জুয়ায় আগুনে ঘি

দ্য টেলিগ্রাফের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। অ্যাশেজ চলাকালে ইংল্যান্ড দল ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিলাসবহুল ক্যাসিনো-হোটেল ‘ক্রাউন টাওয়ার্স’-এ। দাবি করা হয়েছে, পুরো দলই সপ্তাহের পর সপ্তাহ ক্যাসিনোর ভেতর অবস্থান করেছে।

সেখানে থেকে খেলোয়াড়দের নিয়মিত ক্যাসিনোতে যাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপান—সবই হয়েছে প্রকাশ্যেই, ইংল্যান্ড সমর্থক ও সাধারণ মানুষের সামনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংস্কৃতির শুরুটা হয়েছিল ২০২৫ সালের অক্টোবর–নভেম্বরে নিউজিল্যান্ডে ইংল্যান্ডের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সফরের সময়।

এই প্রসঙ্গ সামনে আসে নিউজিল্যান্ড সিরিজে ইংল্যান্ডের ওয়ানডে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের এক অফ-ফিল্ড ঘটনার পর, যা অ্যাশেজের ঠিক এক মাস আগেই আলোচনায় এসেছিল।

নুসা বিরতি আর স্টোকস–ম্যাককালামের ফাটল

রিপোর্টে আরও প্রকাশ পেয়েছে স্টোকস ও ম্যাককালামের মধ্যে টানাপোড়েনের কথা। প্রথম ও দ্বিতীয় টেস্টের মাঝখানে দিন-রাতের ম্যাচের আগে স্টোকস বাড়তি অনুশীলন চেয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাককালাম ছিলেন হালকা প্রস্তুতির পক্ষে।

ব্রিসবেন টেস্টে স্টোকসের রক্ষণাত্মক কৌশল—অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারকে রান করতে দেওয়া—ম্যাককালামকে ড্রেসিংরুমে ভীষণ হতাশ করে। পরে ম্যাচগুলোতে স্টোকস আরও সক্রিয় ভূমিকা না নেওয়ায়ও বিস্মিত হন কোচ।

এই মতবিরোধ প্রকাশ্যেও ধরা পড়ে। স্টোকস বলেন, “অস্ট্রেলিয়া দুর্বলদের জায়গা নয়,” আর ম্যাককালামের দাবি ছিল, দল ‘অতিরিক্ত অনুশীলনে’ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

মাঠের বাইরেও সমালোচনা থামেনি। দ্বিতীয় টেস্টের পর, ০–২ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও দল ছুটি কাটাতে যায় নুসায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকদিন ধরে কিছু খেলোয়াড় ভারী মদ্যপানে মেতে ছিলেন। জো রুট ছাড়া প্রায় কারও পরিবারই তখন সফরে ছিল না—অ্যাডিলেড টেস্ট পর্যন্ত।

ভ্যাপিং, ভাইরাল ভিডিও আর নতুন লজ্জা

বিতর্ক আরও বাড়ে তরুণ তারকা জ্যাকব বেতেলের ঘটনায়। বক্সিং ডে টেস্টের আগে এক রাতে তাঁকে ভ্যাপ করতে দেখা যায়। মজার ব্যাপার, এই ম্যাচেই এমসিজিতে মাত্র দুই দিনে জিতে নেয় ইংল্যান্ড—১৪ বছরে অস্ট্রেলিয়ায় তাদের প্রথম টেস্ট জয়।

এ ছাড়া বেন ডাকেটের একটি ভাইরাল ভিডিওতে তাঁকে অতিরিক্ত মাতাল অবস্থায় উবার খুঁজতে দেখা যায়। রান না পাওয়া ডাকেটকে ঘিরে অফ-ফিল্ড মনোযোগহীনতার অভিযোগ আরও জোরালো হয়। তবে দল থেকে বাদ পড়া অলিভার পোপ নাকি ড্রেসিংরুমে ডাকেটের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

অ্যাশেজ শেষে নতুন মোড়

অস্ট্রেলিয়ায় লজ্জার অধ্যায় শেষ হলেও নাটক থামেনি। রিপোর্টে বলা হয়, খেলোয়াড়েরা ইংল্যান্ডে ফিরে সমালোচনার মুখোমুখি হলেও ম্যাককালাম যান গোল্ড কোস্টে—বিশ্বখ্যাত ‘ম্যাজিক মিলিয়নস’ ঘোড়দৌড় ও নিলাম অনুষ্ঠানে অংশ নিতে।

সব মিলিয়ে এই অ্যাশেজ সিরিজ দেখিয়ে দিয়েছে—ইংল্যান্ডের সমস্যা শুধু ক্রিকেটে নয়। মনোভাব, শৃঙ্খলা আর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, স্টোকস–ম্যাককালামের দ্বন্দ্ব ও মাঠের বাইরের বিভ্রান্তিই শেষ পর্যন্ত অ্যাশেজ বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

news