রেলওয়ে কর্মচারী ও পোষ্যদের অধিকার হত্যার খেলা বন্ধে রেলপথ মন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি কেন্দ্রীয় সভাপতি মোঃ মনিরুজ্জামান মনির। আজ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ (মঙ্গলবার) সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান তিনি।

বিজ্ঞপ্তিতে মনিরুজ্জামান মনির বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইতিপূর্বে পয়েন্টসম্যান ট্রাফিক বিভাগের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্য হতে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান প্রথা প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশ রেলওয়ে নন—গেজেটেড সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুল ১৯৮৫ ক্রমিক নং—১৬৩ সুস্পষ্ট ভাবে পয়েন্টসম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগের কোন সুযোগ রাখা হয় নাই। কারণ ট্রাফিক বিভাগের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের চাকুরী ৩ বছর পূর্তি সাপেক্ষে পয়েন্টসম্যান এর শূন্য পদ গুলো পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের বিধান সুনিশ্চিত ভাবে সংরক্ষণ করা আছে। পয়েন্টসম্যানগণ ট্রেন পরিচালনায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন ফলে ট্রাফিক বিভাগের সাথে সম্পৃক্ততা ও অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন। এই সকল পয়েন্টসম্যানগণ পরবতীর্তে বিভিন্ন পদোন্নতিযোগ্য পদে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় শ্রেণীর বিভিন্ন ধাপের গুরত্বপূর্ণ পদে ধারাবাহিক শূন্য পদের বিপরীতে প্রচলিত নিয়মনীতি অনুসরণে যেখানে যা প্রযোজ্য তদানুযায়ী পদায়িত হয়ে থাকেন। ফলে ট্রাফিক বিভাগের চলমান দৈনন্দিন কাজকর্ম নির্বিঘ্নে পরিচালনা হয়ে আসছিল।

তিনি বলেন, অপরদিকে “বাংলাদেশ রেলওয়ে ক্যাডার বহির্ভূত কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা ২০২০” এর ক্রমিক নম্বর ১৪৩ এ অতীতের সকল চলমান নিয়মনীতিকে উপেক্ষা করে সরাসরি নিয়োগ ৫০% এবং পদোন্নতির মাধ্যমে ৫০% ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন ৪র্থ শ্রেণীর পদে ৫ বছর চাকুরী সম্পন্নকারীদের পদোন্নতির মাধ্যমে পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে নবনিয়োগের ক্ষেত্রে অদক্ষ ও এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাশ শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নবনিয়োগ বিধিমালা ২০২০ এর মাধ্যমে পয়েন্টসম্যান পদের সরাসরি নিয়োগ ৫০% শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি সমমান অপর দিকে চতুর্থ শ্রেণীর ট্রাফিক কর্মচারীর পদে পদোন্নতির মাধ্যমে ৩ বছরের স্থলে ৫ বছর করা হয়েছে, ১০০% পদোন্নতির স্থলে ৫০% রাখা হয়েছে যা বিব্রতকর একই সাথে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিমাতা সুলভ আচরণ ও স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি।

তিনি আরো বলেন, অদক্ষ জনবল ও শিক্ষাগত যোগ্যতার এইচএসসি মান নির্ধারণের মাধ্যমে যে জনবল নিয়োগ করা হবে তার পদে উপযুক্ত কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের সমকক্ষ করে গড়ে তুলতে যে সময় ও অর্থ ব্যয় হবে একই সাথে দায়িত্ব পালনকালে সামান্য ভুলের জন্য ট্রেন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও দূর্ঘটনার কারণে জানমাল ও রেলওয়ের সম্পদের বিপুল ক্ষয়—ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই নিয়োগের ফলে সময়, আর্থিক ক্ষতি, জানমাল ও রেলওয়ে সম্পদের ক্ষতির দায়—দায়িত্ব কে নেবে? নিয়োগকারী কতৃর্পক্ষ?

তিনি বলেন, দক্ষ পয়েন্টসম্যানগণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের সংযোগ, লাইনের পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে নিজেরাই দূর্ঘটনার শিকার হন কোন কোন ক্ষেত্রে আহত এমন কি নিহত হয়েও রেলের সম্পদ, জানমাল বাঁচিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপনের নজির রয়েছে। এর মূল কারণ তাদের পূর্ব রেল সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা এবং পরবতীর্তে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পরিপূর্ণযোগ্য সুবিবেচক ও তাৎক্ষনিক উপস্থিত বুদ্ধির মাধ্যমে দৈনন্দিন রুটিন মাফিক কাজকর্ম করে ট্রাফিক বিভাগের কাজকর্ম পরিচালনায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে থাকেন। অনভিজ্ঞ—অদক্ষ কর্মচারী কি এই কঠিন গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষম?

মনিরুজ্জামান মনির বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে প্রায় ১০০ ধরনের খালাসী পদ রয়েছে। এই সকল খালাসী বা চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্য হতে পদোন্নতি যোগ্য বিভিন্ন পদে কোন কোন ক্ষেত্রে ১০০%, কোন কোন ক্ষেত্রে ৫০% পদোন্নতির বিধান আছে। অথচ কোটার বিন্যাস অনুযায়ী পদোন্নতি না দিয়ে সকল পদে সরাসরি নিয়োগ আইনের বরখেলাপ। উদাহরণ স্বরূপ লোকসেড খালাসী হতে লোকো মাস্টার গ্রেড—২ পদে পদোন্নতির বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। সম্প্রতি বিতর্কিত ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধিতে লোকো মাস্টার গ্রেড—২ পদে অদক্ষ জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। অথচ লোকো খালাসীতে শত শত দক্ষ জনবল থেকে দক্ষ লোকো মাস্টার গ্রেড—২ পদে নিয়োগ দিয়ে কর্মচারীদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত ছিল কিন্তু বর্তমান রেলপথ মন্ত্রী শুধুমাত্র নিয়োগ বানিজ্য করতেই দক্ষ জনবলকে নিয়োগ না দিয়ে সরাসরি অদক্ষ জনবল নিয়োগ করছে। এই সকল কাজে শ্রমিক দরদী কিছু মুখোশধারী কর্মকর্তারা বিদেশে অর্থের পাহাড় গড়তে রেলপথ মন্ত্রীকে নিজেদের স্বার্থে সহযোগিতা করছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি আরো বলেন, ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধিতে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফলাফল প্রকাশ এর ধরন দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে মেধাবী নির্বাচনের নামে রেলওয়ে পোষ্যদের চাতুরতার সাথে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। লোকো মাস্টার গ্রেড—২, গার্ড গ্রেড—২, সহকারী স্টেশন মাস্টার এর ফলাফলে রেলওয়ে পোষ্য, মুক্তিযোদ্ধা, অন্যান্য কোটা থেকে কত পার্সেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা নাই। স্বাভাবিক কারনে রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি মনে করে রেলপথ মন্ত্রী ও নিয়োগ কমিটি পরীক্ষা এবং ফলাফলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনিয়মের মাধ্যমে তাদের সিন্ডিকেটের সদস্য দিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিচ্ছেন এবং কোটি কোটি টাকা নিয়োগ বানিজ্য করছেন। পূর্বের নিয়োগ বানিজ্য সিন্ডিকেটরা পুকুর চুরি করতো বর্তমান সিন্ডিকেট সাগর পরিমাণ নিয়োগ বানিজ্য করছে। সকলেই জানেন কিন্তু প্রমাণ নাই। লোকো মাস্টার গ্রেড—২, গার্ড গ্রেড—২, সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে পরীক্ষার পূর্বেই এমসিকিউ এবং ভাইভাসহ ১৫—২৫ লক্ষ টাকার চুক্তিতে চাকরি নিশ্চিতে কাজ করছে নিয়োগ কমিটির আস্থাভাজন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। অপেক্ষায় থাকা পয়েন্টসম্যান, খালাসী, বুকিং সহকারী, গেইট কিপার চাকরি প্রত্যাশী প্রার্থীদের এমসিকিউ এবং ভাইভা উত্তীর্ণসহ চাকরি নিশ্চিত করতে ১০—১৫ লক্ষ টাকা নিলাম তুলেছেন। আগে নিয়োগ বানিজ্য করতো একটি সিন্ডিকেট এখন নিয়োগ বানিজ্য করে পাঁচটি সিন্ডিকেট। স্বৈরাচারিতা নিয়োগ বিধিমালা ২০২০ এবং অনুমোদিত জনবল ৪৭৬৩৭ জন এর বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে, রেলপথ মন্ত্রণালয়, হিসাব বিভাগ এর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলমান রয়েছে। দ্বন্দ্বের কারণে কারণে এই ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিধিমালা ২০২০ ও অনুমোদিত জনবল তার বৈধতা হারিয়েছে। দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট কর্মচারী ও পোষ্যদের অধিকারসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেই চলেছে। তারা কারো কোন মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে নিয়োগ বানিজ্যের নেশায় মেতে উঠেছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও বাস্তবে রেলপথ ধ্বংসের পথে ধাবিত হবে।

মনিরুজ্জামান মনির বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির পক্ষ থেকে রেলওয়ে কর্মচারী ও পোষ্যদের অধিকার হত্যার খেলা বন্ধে রেলপথ মন্ত্রীকে আহ্বান জানান এবং রেলওয়ের চলমান সংকট মুহুর্তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। news