মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে ভারতের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বাণিজ্য যুদ্ধ সামাল দিতে নয়াদিল্লি তিনটি কৌশল একসাথে চালাচ্ছে।

প্রথমত, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি করতে না পারলেও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশীয় সমর্থন ধরে রাখতে চান। দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সূক্ষ্মভাবে সামলাতে গিয়ে পুরনো সীমান্ত উত্তেজনা ভুলে না গিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খুঁজছে। তৃতীয়ত, বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার তৈরি করে অর্থনীতিকে বৈচিত্রময় করতে চাইছে ভারত।

শুল্কের ধাক্কায় অর্থনীতি ঝুঁকিতে
‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর বিশ্লেষণ বলছে, গত বছর ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি জিডিপির ২ শতাংশ ছিল। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা গোল্ডম্যান শ্যাক্সের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক প্রথম ধাপে ভারতের প্রবৃদ্ধি কমাবে অন্তত ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট। দ্বিতীয় দফায় শুল্ক কার্যকর হলে ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।

এ অবস্থায় নয়াদিল্লির সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলে বৈচিত্র ধরে রাখা ছাড়া। তবে এই "অর্থনৈতিক জুয়া" যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে, যা মোদির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর কষাকষি
ট্রাম্পের চাপের মুখে ভারত চাইছে মার্কিন ৫৫ শতাংশ রপ্তানির উপর শুল্ক কমাতে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি পণ্য কেনা বাড়াতে রাজি নয়াদিল্লি। তবে পনির ও বাদামের মতো কিছু কৃষি পণ্যে সীমিত ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে দেশীয় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

তবে সমস্যা হলো, এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিলে ভারতীয় কৃষক ক্ষুব্ধ হতে পারেন, আর সেটি রাজনৈতিক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে বিজেপির জন্য। আরও বড় ঝুঁকি হলো—ট্রাম্পের অনিশ্চিত মনোভাব। তিনি ইতিমধ্যেই একবার ভারতের সঙ্গে চুক্তি না করেই শুল্ক বসিয়েছেন। ফলে ভারত নিশ্চিত নয়, চুক্তি হলেও তা টিকবে কিনা।

চীন কি ভরসা হতে পারে?
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো ভারতের জন্য একটি বিকল্প। সম্প্রতি বেইজিং ইউরিয়ার রপ্তানি শিথিল করেছে, যা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। তবে বাস্তবতা হলো, চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ইলেকট্রনিক্স, টেক্সটাইলসহ নানা পণ্যে ভারত নির্ভরশীল।

চীনের বাজারে ঢুকতে পারলেও সমস্যা আছে। অতিরিক্ত সহযোগিতায় ভারতীয় বাজার চীনা পণ্যে সয়লাব হতে পারে। আবার সীমান্তে উত্তেজনা বজায় থাকলে মোদি দুর্বল প্রমাণিত হবেন। তাই নয়াদিল্লিকে এই ভারসাম্যটা খুবই সতর্কতার সঙ্গে বজায় রাখতে হচ্ছে।

বিকল্প অংশীদার খোঁজার চেষ্টা
ভারত এখন চীন-মার্কিন প্রভাব থেকে বেরিয়ে নতুন অংশীদার খুঁজছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওমান এবং পেরুর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করেছে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভারতের ১৮ শতাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রমুখী, আর ১৫ শতাংশ আমদানি আসে চীন থেকে। এই নির্ভরশীলতা এক ঝটকায় ভাঙা সম্ভব নয়। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ইতিমধ্যেই মার্কিন বাজারে কম শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে, যা ভারতের জন্য বড় প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।

ওষুধশিল্প ও সেমিকন্ডাক্টরে ভারত বিকল্প তৈরি করলেও, কাঠামোগত সংস্কারে অনীহা ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ধীরগতি ভারতের জন্য বড় বাধা। তার ওপর অ্যাপলের সিইও টিম কুককে ট্রাম্পের সতর্কবার্তা দেখিয়েছে যে, মার্কিন কোম্পানিগুলো সহজে ভারতে বিনিয়োগ সরিয়ে আনবে না।

সব মিলিয়ে, নয়াদিল্লি এখন এক দোটানায়—ট্রাম্পের শুল্কের চাপ, চীনের প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব। এই ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে পারবে কি ভারত, নাকি অর্থনৈতিক জুয়ার বোঝা আরও বাড়বে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

 

Walton Ads