প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের নিজেদের ইচ্ছায় ধর্ম গ্রহণ এবং জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী যদি স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং নিজের পছন্দমতো বিয়ে করতে চান, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে তাঁর বাবা বা অন্য কেউ বাধা দিতে পারেন না । ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ গত ৩১ জুলাই হেবিয়াস কর্পাস রিটের শুনানির সময় এই পর্যবেক্ষণ দেন। মামলাটি সম্পর্কিত দুই বোন—বিশ বছর বয়সী দিব্যা ভাটিয়া ওরফে জয়া দিয়া ভাটিয়া এবং পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী অংশু ভাটিয়া ওরফে আমিনা অংশু ভাটিয়া। তাঁরা হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজেদের পছন্দমতো ব্যক্তিদের বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন । রিটে অভিযোগ করা হয়, বাবার অমতে তাঁদের স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়েছে।

আদালত বলেছেন, এই অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় বাবার বা অন্য কারও হস্তক্ষেপ তাঁদের সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত অধিকার—মর্যাদা, গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বায়ত্তশাসনের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে । আদালত আরও উল্লেখ করে যে, উভয় নারীই প্রাপ্তবয়স্ক এবং আইনত তাঁদের ধর্ম, বিবাহ, বসবাস ও ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন ।

তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই মামলায় তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে দুই বোন স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নাকি কোনো ধরনের অবৈধ আটক বা চাপের মুখে রয়েছেন । এই উদ্দেশ্যে আদালত উত্তরপ্রদেশ কর্তৃপক্ষ এবং ওই দুই বোনের বাবাকে আগামী ৬ আগস্ট তাঁদের আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছে । আদালত সরাসরি দুই বোনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সিদ্ধান্তের স্বেচ্ছাচারীতা যাচাই করবে । নির্দিষ্ট তারিখে তাঁদের হাজির করা না গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিল করতে হবে ।

ওই দুই বোনের আইনজীবীরা আদালতে জানান, তাঁরা সুস্থ মস্তিষ্কে, কোনো প্রকার জবরদস্তি, প্রলোভন বা প্রভাব ছাড়াই স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন । আরও জানান, বাবা তাঁদের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০২৫ সালের ৪ মে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৭ ধারায় মিথ্যা মামলা করেছেন—যা বিয়ে করতে বাধ্য করার জন্য নারীকে অপহরণ বা প্ররোচিত করার শাস্তি নির্ধারণ করে । যেহেতু ধর্মান্তর স্বেচ্ছায় হয়েছে, তাই উত্তরপ্রদেশের অবৈধ ধর্মান্তর প্রতিরোধ আইন, ২০২১-এর বিধান এখানে প্রযোজ্য নয় বলেও যুক্তি দেন আইনজীবীরা ।

ঘটনার পটভূমি

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মান্তর বিরোধী আইন থাকলেও, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ব্যক্তিগত পছন্দের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অধিকার নিয়ে প্রায়ই আদালতে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের (ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ । প্রসঙ্গত, এলাহাবাদ হাইকোর্টের ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে—১৯২১ সালে এই আদালতই ভারতের প্রথম নারী আইনজীবী কর্নেলিয়া সোরাবজিকে 'ব্যক্তি' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এনরোল করেছিল, যা নারী অধিকারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক ।

Walton Ads