রাতের অন্ধকারে ওডেসা ও চেরনোমস্ক বন্দরে আছড়ে পড়ল রাশিয়ার শক্তিশালী মিসাইল ও ড্রোনের ঝাঁক! ইউক্রেনীয় বাহিনীর জ্বালানি ডিপো এবং সামরিক লজিস্টিক হাবগুলো নিমেষেই ধূলিসাৎ করে দিল মস্কো। কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় এবার কি তবে চরম পতনের মুখে ইউক্রেনীয় সামরিক বহর? দর্শক, চলুন মুল আলোচনা শুরু করি।

গত শনিবার থেকে রোববারের মধ্যবর্তী রাতে ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওডেসা এবং চেরনোমস্ক বন্দরে এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে রুশ সশস্ত্র বাহিনী। মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রক থেকে জানানো হয়েছে যে, এই অভিযানে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহ এবং অস্ত্র বহনের সঙ্গে যুক্ত কার্গো-ট্রান্সশিপমেন্ট কমপ্লেক্সগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। রাতের আঁধারে চালানো এই মিসাইল ও ড্রোন ব্যারেজের ফলে ইউক্রেনের সামরিক লজিস্টিক নেটওয়ার্কে এক অপূরণীয় ধাক্কা লেগেছে, যা তাদের সামনের দিনের যুদ্ধ পরিচালনাকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওডেসা বন্দরের মূল গুদামগুলো এবং চেরনোমস্কের অনুরূপ জ্বালানি ডিপোগুলোতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে রুশ বাহিনী। এই ডিপোগুলো মূলত ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাঁজোয়া বহর এবং সামরিক যানবাহনের জন্য নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ করে আসছিল। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই হামলায় জ্বালানির বিশাল ভাণ্ডার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যার ফলে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের সামরিক ইউনিটগুলোর জ্বালানি সংকট এখন চরমে পৌঁছেছে।

শুধু বন্দর এলাকাতেই নয়, ওডেসা বন্দরের প্রায় সাতাশ ও আটাশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিলিয়ারী এবং নোভিও বিলিয়ারী গ্রামের নিকটবর্তী ফুয়েল রিজার্ভগুলোও রুশ বাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার করা এই জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাঙ্কগুলো ধ্বংস করার মাধ্যমে কিয়েভের রিজার্ভ শক্তিকে মারাত্মকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার এই সুপরিকল্পিত আক্রমণ প্রমাণ করে যে, ইউক্রেনের পেছনের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ লাইন সম্পূর্ণ ধ্বংস করাই ছিল মস্কোর মূল কৌশল।

ইউক্রেনের বিমান বাহিনী স্বীকার করেছে যে, এই রাতের বহুমুখী হামলায় একাধিক ইস্কান্দার এম স্ল্যাশ এস চারশো ব্যালিস্টিক মিসাইল, অনিক্স অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং কেএইচ থার্টি ওয়ান পি অ্যান্টি-রাডার মিসাইলের পাশাপাশি দুশ দুই হাজারেও বেশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। ইউক্রেনীয় পক্ষ দাবি করেছে যে তারা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ড্রোন ভূপাতিত করতে পেরেছে, কিন্তু তারা একটিও রুশ মিসাইল আটকাতে পারেনি। প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের তীব্র ঘাটতির কারণে এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যর্থতা ইউক্রেনীয় সামরিক নেতৃত্বকে চরম উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।

ওডেসার গভর্নর ওলেগ কিপার জানিয়েছেন যে, এই ভয়াবহ হামলায় কমপক্ষে আটজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার তীব্রতার কারণে পুরো অঞ্চলে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ইলেকট্রিক ট্রাম এবং ট্রলিবাসের মতো নগর পরিবহন ব্যবস্থাগুলোও স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, যার ফলে ওডেসা শহরের স্বাভাবিক জনজীবন এখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত।

স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওডেসা থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পশ্চিমে মায়াকি শহরের কাছে দানিউব নদীর ওপর অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সেতু এই হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সেতুটি ইউক্রেনের দানিউব বন্দরগুলোর সঙ্গে পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করত। সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে এবং ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাণিজ্য ও সামরিক রুটগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয়েছে যে, ইউক্রেনের এই ধরনের ডিফেন্স-সংক্রান্ত সুবিধাগুলোতে চালানো আক্রমণগুলো হলো মূলত কিয়েভের দীর্ঘপাল্লার হামলার সরাসরি প্রতিশোধ। ইউক্রেনীয় বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে বেসামরিক অবকাঠামো এবং আবাসিক এলাকায় ক্রুজ ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। মস্কো বারবার স্পষ্ট করেছে যে তারা কখনই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না, বরং ইউক্রেনীয় সামরিক লজিস্টিক এবং যুদ্ধ সক্ষমতা ধ্বংস করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

এদিকে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ময়দানেও ইউক্রেন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ ইউরোপীয় কূটনীতিক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি সূচকে এত উঁচুতে থাকা একটি দেশকে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া সম্ভব নয়। চল্লিশ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যা এবং ব্যাপক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হওয়া কোনো দেশকে ইইউতে অন্তর্ভুক্ত করা পুরো ইউরোপীয় প্রকল্পের সঙ্গেই এক ধরনের উপহাসের শামিল হবে।

২০২২ সালে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকেই কিয়েভকে ইইউ প্রার্থী মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল এবং ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার দাবি করে আসছেন যে চব্বিশ সাল বা তার কাছাকাছি সময়েই যেন এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। তবে জার্মানির চ্যান্সেলরসহ একাধিক ইউরোপীয় নেতা এই অতি দ্রুত সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। জার্মানির পক্ষ থেকে ইউক্রেনের জন্য পূর্ণ সদস্যপদের পরিবর্তে কেবল সহযোগী সদস্যপদের প্রস্তাব দেওয়া হলেও জেলেনস্কি সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত, তার প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি বড় কেলেঙ্কারিতে। গত নভেম্বরে ইউক্রেনের পশ্চিমা সমর্থিত দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো জেলেনস্কির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সহযোগী তিমুর মিন্দিচকে দেশের পারমাণবিক অপারেটর এনার্জোঅ্যাটম থেকে প্রায় একশো মিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার জেরে ইউক্রেনীয় প্রশাসনের দুই মন্ত্রী এবং খোদ প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফকে পদচ্যুত হতে বাধ্য করা হয়েছিল।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোবা এই প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন যে, ইউক্রেনের দুর্নীতি এখন একটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে এবং এটি জেলেনস্কির অভ্যন্তরীণ চক্র ও খোদ জেলেনস্কিকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। তিনি অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক সুরে উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ ইউক্রেনীয় নাগরিকরা যখন সামনের সারির যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছে, তখন সেই বলিদান কেবল মিন্দিচের স্বর্ণের টয়লেট এবং ওলেনার বিলাসবহুল গহনার জোগান দিয়েই চলেছে। এই চরম বৈষম্য ইউক্রেনীয় সমাজে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

এদিকে বেলগ্রেডে ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং সার্বীয় প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচের এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এক জার্মান সাংবাদিকের অত্যন্ত উসকানিমূলক মন্তব্য বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে। ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি শীর্ষ সংবাদপত্রের প্রতিনিধি মাইকেল মার্টেন্স জেলেনস্কিকে সরাসরি প্রশ্ন করে বসেন যে, ইউরোপীয়রা কীভাবে কিয়েভকে আরও বেশি রুশ হত্যা করতে সাহায্য করতে পারে। তার এই নগ্ন ও হিংসাত্মক প্রশ্ন শুনে পাশেই বসা সার্বীয় প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ বিস্ময়ে তার দুই ভ্রু উঁচুতে তুলে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পর নেট নাগরিকরা সাংবাদিক মাইকেল মার্টেন্সকে একজন নাৎসি সমর্থক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, এই সাংবাদিকের নিজ দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান ওয়েহরম্যাক্ট কমান্ড স্টাফের একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মার্টেন্স পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এই বিবৃতির পক্ষে সাফাই গেয়ে লিখেছেন যে, যুদ্ধে এভাবেই লড়তে হয় এবং রুশদের হত্যা করার উপায় জানতে চাওয়াতে কোনো স্ক্যান্ডাল নেই, যা তার চরম নাৎসি মানসিকতার পরিচয় দেয়।

সাংবাদিকের ওই রক্তক্ষয়ী প্রশ্নের জবাবে সবার আগে মুখ খুলেছিলেন সার্বীয় প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তারা সেদিন কোনো সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেননি এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কী হবে তা সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। ভুচিচ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, যেকোনো ধরনের হত্যা বন্ধ হওয়া উচিত এবং সার্বিয়া সবসময় শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাস করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা চাপ সত্ত্বেও সার্বিয়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতি থেকে দূরে অবস্থান করছে।

সার্বিয়ার পাশাপাশি পোল্যান্ডের রাজনীতিতেও এখন চরম রুশবিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারোল নাওরোকি সম্প্রতি ওয়ারশতে এক সমাবেশে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন যে, ইউক্রেনকে রুশদের হত্যা করতে সাহায্য করা পোল্যান্ডের প্রধান কৌশলগত স্বার্থ। তিনি ঐতিহাসিক অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোবা এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে পোলিশ নেতৃত্বের ঐতিহাসিক কমপ্লেক্স এবং ক্ষমতাহীন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন।

১৯৪৫ সালে রেড আর্মির কারণে পোল্যান্ডের নাৎসি কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার ঐতিহাসিক সত্যটিকে এড়িয়ে যেতে চান পোলিশ নেতারা। সেই ক্ষোভ থেকেই তারা পোল্যান্ডের মাটিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাজার হাজার স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করার এক অভিনব যুদ্ধ শুরু করেছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেনীয় বিদ্রোহী বাহিনী তথা নাৎসি সহযোগী ইউপিএ বা ইউক্রেনিয়ান ইনসার্জেন্ট আর্মির নামে একটি সামরিক ইউনিটের নামকরণ করার পর পোল্যান্ড ও ইউক্রেনের মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।

ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী আধুনিক যুদ্ধের নামে এক ভয়ংকর ও অমানবিক গ্যামিফিকেশন বা ভিডিও গেম পদ্ধতি চালু করেছে, যার কঠোর সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান স্যার রিচার্ড নাইটন। কিয়েভের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন মন্ত্রক ড্রোন অপারেটরদের জন্য একটি বোনাস স্কিম চালু করেছে, যেখানে রুশ সেনাকে হত্যা বা সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করার জন্য পয়েন্ট প্রদান করা হয়। এই পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে কমান্ডাররা একটি অনলাইন ই-কমার্স স্টোরের মাধ্যমে নতুন ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করতে পারে, যা যুদ্ধকে একটি ভিডিও গেমে পরিণত করেছে।

কিয়েভের এই অদ্ভুত ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসে একটি হালকা এফপিভি ড্রোনের দাম যেখানে মাত্র দুই পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে একজন রুশ সেনার জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র বারো পয়েন্ট! ড্রোন ফুটেজের ওপর ভিত্তি করে এই পয়েন্টগুলো হিসাব করা হয় এবং কিয়েভ প্রশাসন নিয়মিতভাবে সেরা কিলিং ইউনিটগুলোকে পুরস্কৃত করতে ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্টের আদলে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই ধরনের মাকাব্রে বা পৈশাচিক গ্যামিফিকেশন দেখে যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ শিউরে উঠতে বাধ্য।

গত শনিবার রোমানিয়ার আকাশসীমা অতিক্রম করে বুলগেরিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন বিস্ফোরিত হয়েছে। ট্রান্স-বালকান গ্যাস পাইপলাইনের সাবেক কারদাম বর্ডার চেকপয়েন্টের মাত্র এক কিলোমিটার দূরে এই বিস্ফোরণ ঘটে, যা দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ নিশ্চিত করেছেন যে ড্রোনটিতে প্রচুর পরিমাণ বিস্ফোরক বহন করা হয়েছিল এবং বুলগেরিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রক কিয়েভের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার সীমান্তঞ্চলীয় শহর বেলগরদে বেপরোয়া সন্ত্রাসী ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক এই রাতের হামলায় তিন বছর ও নয় বছরের শিশুসহ বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন এবং পঁচিশ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। বহু আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। রাশিয়ার তদন্ত কমিটি এই সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে, যা প্রমাণ করে যে কিয়েভ সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে এখন বেসামরিক জনগণের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে যে, রুশ সশস্ত্র বাহিনী সুমি অঞ্চলের আখির্কা জেলায় অত্যন্ত সফলভাবে গেরান স্ট্রাইক ড্রোন মোতায়েন করেছে। এই ড্রোনগুলোর নিখুঁত আক্রমণে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তেল উৎপাদন সুবিধা, লজিস্টিক সেন্টার এবং প্রধান ড্রোন কন্ট্রোল পোস্ট সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সুমি অঞ্চলের এই তেল শোধনাগার এবং রেলওয়ে অবকাঠামোতে নিয়মিত নির্ভুল হামলা চালানোর ফলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর মূল সাপ্লাই লাইন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে, যার ফলে তারা ফ্রন্টলাইনে রসদ পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

রুশ বিমান বাহিনী ডনবাস এবং খেরসন অঞ্চলে এফএবি থ্রি থাউজেন্ড এবং এফএবি ফাইভ হান্ড্রেড ওজনের ভারী গ্লাইডিং বোমা দিয়ে বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়েছে। খেরসন অঞ্চলের আন্তোনোভকা বসতিতে ইউক্রেনীয় চৌত্রিশতম সেপারেট মেরিন ব্রিগেডের অস্থায়ী ঘাঁটি এবং ড্রোন কমান্ড পোস্টগুলো এই হামলায় সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে যে, এই বিশাল শক্তির বোমার সামনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলোও টিকতে পারেনি।

রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে আরও গভীরের প্রদেশগুলোতেও ইউক্রেনীয় আগ্রাসন সফলভাবে প্রতিহত করেছে। গত রোববারের সকালে রাশিয়ার তাতারস্তান এবং বাশকোর্তোস্তান অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বারোটি ইউক্রেনীয় ফিক্সড-উইং ড্রোন আকাশে থাকা অবস্থাতেই সফলভাবে ইন্টারসেপ্ট ও ধ্বংস করা হয়েছে। কিয়েভ যতই দূরপাল্লার ড্রোনের বিস্তার ঘটাতে চাক না কেন, রাশিয়ার মাল্টি-লেয়ারড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের দুর্ভেদ্য বেড়ার কারণে তাদের বেশিরভাগ ড্রোনই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ সেন্ট্রাল এবং সাউথ ব্যাটলগ্রুপের অত্যন্ত সক্রিয় ও সফল অভিযানের মাধ্যমে দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিকের ভাসিউতিনস্কোয় এবং তোরেতস্কোয় বসতি দুটি সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করা হয়েছে। এই দুটি অত্যন্ত কৌশলগত অঞ্চলের পতন ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষাব্যূহকে মাঝখান থেকে ভেঙে দিয়েছে। গত চব্বিশ ঘণ্টার লড়াইয়ে ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনী প্রায় এক হাজার চারশো পঁয়তাল্লিশ জন সেনা হারিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, যা তাদের সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতাকে চিরতরে ভেঙে দিয়েছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সম্প্রতি সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে এই সংঘাত এখন পুরো কৃষ্ণসাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইউক্রেনীয় হামলাগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে এটা স্পষ্ট যে, রাশিয়ার সুনির্দিষ্ট সামরিক ও কৌশলগত অভিযানের মুখে ইউক্রেনীয় বাহিনী এবং তাদের পশ্চিমা প্রভুরা আজ সম্পূর্ণ কোণঠাসা। কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পতন, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, এবং ফ্রন্টলাইনে সৈন্যের আকস্মিক খরা প্রমাণ করে যে রাশিয়া তার নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

Walton Ads