একদিকে ভারতের উপর নেমে আসছে আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক আঘাত। মার্কিন সিনেট পাস করেছে এমন একটি বিল, যাতে ভারতের পণ্যের উপর বসতে পারে একশ শতাংশ অতিরিক্ত ট্যারিফ।
অন্যদিকে মক্কার পবিত্র শহরে বসে হাত মিলিয়েছেন তিন মুসলিম দেশের নেতা। সৌদি আরব, তুরস্ক আর পাকিস্তান, একসঙ্গে তৈরি করেছে এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি, যাকে অনেকে বলছেন, ইসলামি ন্যাটো।
প্রশ্ন হলো, এই দুটি ঘটনা কি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত? ভারতের অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাংলাদেশের জন্য কি তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগ? আর এই নতুন সামরিক জোট বিশ্বের ক্ষমতার হিসাব কীভাবে বদলে দিতে পারে?
পশ্চিমা বিশ্বে ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’: আমেরিকা ও ভারতের নিরাপত্তার জন্য কি এটি নতুন কোনো বড় হুমকি?
আজকের প্রতিবেদনে থাকছে এই দুটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
প্রথমে আসি ভারত-আমেরিকা ট্যারিফ সংকটের ইতিহাসে। এই সংকটের শুরু দুই হাজার পঁচিশ সালের আগস্ট মাসে।
সে সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতের পণ্যের উপর বসায় পঁচিশ শতাংশ পাল্টা ট্যারিফ। এর কিছুদিন পরেই যুক্ত হয় আরও পঁচিশ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক। কারণ হিসেবে বলা হয়, ভারত রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কিনছে।
এভাবে দুই হাজার পঁচিশ সালের আগস্টের শেষ নাগাদ ভারতের পণ্যের উপর মোট ট্যারিফ দাঁড়ায় পঞ্চাশ শতাংশে।
এটি ছিল আমেরিকার কোনো বড় বাণিজ্য অংশীদারের উপর আরোপিত সর্বোচ্চ শুল্কহারগুলোর একটি।
ভারত এই সিদ্ধান্তকে অন্যায় ও অযৌক্তিক বলে দাবি করে। তবে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভারত পিছু হটেনি বলেও জানায় দিল্লি।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই উচ্চ ট্যারিফের পেছনে শুধু বাণিজ্য নয়, রাজনৈতিক ক্ষোভও কাজ করেছে। বিশেষ করে, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রস্তাব ভারত প্রত্যাখ্যান করেছিল বলে জানা যায়।
তবে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন সবসময় একই রকম থাকেনি। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেয়।
এই চুক্তির পর রাশিয়ার তেল সংক্রান্ত অতিরিক্ত পঁচিশ শতাংশ শুল্ক তুলে নেয় আমেরিকা। এরপর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে পুরনো জরুরি ক্ষমতা আইনভিত্তিক ট্যারিফ কাঠামো অবৈধ ঘোষণা করে।
ফলে নতুন আইনি কাঠামোয় ভারতের উপর ট্যারিফ নেমে আসে প্রায় দশ শতাংশে। কিছুদিনের জন্য মনে হয়েছিল, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকের দিকে যাচ্ছে।
কিন্তু রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি থেমে যায়নি। আর এখান থেকেই শুরু হয় নতুন উত্তেজনার অধ্যায়, যা আমরা একটু পরেই বিস্তারিত আলোচনা করব।
এবার আসি দ্বিতীয় ঘটনায়, সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা জোটের প্রেক্ষাপটে। এই জোটের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও আগে, দুই হাজার পঁচিশ সালের সেপ্টেম্বরে।
সে সময় সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এই চুক্তিতে বলা হয়, দুই দেশের যেকোনো একটির উপর হামলা মানে উভয়ের উপর হামলা।
এই চুক্তি সইয়ের ঠিক আগে ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় হামলা চালিয়েছিল বলে জানা যায়। এই ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সৌদি-পাকিস্তান এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর তুরস্কও এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।প্রায় এক বছরের আলোচনার পর, দুই হাজার ছাব্বিশ সালের সাত আগস্ট, তিন দেশ মক্কায় ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে সই করে।
এই দীর্ঘ প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি, কারণ এখান থেকেই বর্তমান পরিস্থিতির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই দুই ঘটনায় কার স্বার্থ ঠিক কোথায় জড়িত?
প্রথমে আসি আমেরিকার প্রসঙ্গে। ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য, রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করা।
আমেরিকার হিসাব হলো, রাশিয়ার তেল বিক্রি কমিয়ে দিলে মস্কোর যুদ্ধ চালানোর সামর্থ্য কমে যাবে। আর ভারত ও চীন, রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় দুই ক্রেতা।
তাই এই দুই দেশের উপর চাপ প্রয়োগকে আমেরিকা তার রাশিয়া-নীতির একটি প্রধান হাতিয়ার মনে করছে। পাশাপাশি এর মধ্য দিয়ে নিজের দেশীয় শিল্পের জন্য বাজার সুবিধা আদায়েরও চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
এবার আসি ভারতের প্রসঙ্গে। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল সাশ্রয়ী রুশ তেলের উপর।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের মোট তেল আমদানির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে রাশিয়া থেকে। প্রতিদিন প্রায় ষাট থেকে আশি লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি রুশ তেল কিনছে ভারত, বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী।
দিল্লির জন্য এই তেল শুধু জ্বালানি নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। একইসঙ্গে ভারত তার কৌশলগত স্বাধীনতা বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি রক্ষা করতে চায়।
অর্থাৎ, শুধু আমেরিকার চাপে নিজের বৈদেশিক নীতি বদলাতে রাজি নয় দিল্লি। এই অবস্থান থেকেই তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটন-দিল্লি টানাপোড়েন।
এবার আসি রাশিয়ার প্রসঙ্গে। মস্কোর জন্য ভারত ও চীনের বাজার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপের বাজার হারিয়ে রাশিয়া এশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। রাশিয়ার মোট তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ, আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশের বেশি, এখন যাচ্ছে ভারতে।
তাই ভারতের উপর আমেরিকার চাপ কার্যত মস্কোর জন্যও একটি পরোক্ষ চাপ। এবার আসি দ্বিতীয় ঘটনায়, সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটে জড়িত দেশগুলোর স্বার্থে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে চাইছে কে?
সৌদি আরবের জন্য মূল উদ্বেগ, নিজের নিরাপত্তা। দীর্ঘদিন সৌদি আরব তার নিরাপত্তার জন্য মূলত আমেরিকার উপর নির্ভরশীল ছিল।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ইয়েমেন থেকে হুতিদের হামলার হুমকি বাড়ছে। এতে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে রিয়াদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তাই সৌদি আরব চাইছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে। পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা এক্ষেত্রে রিয়াদের জন্য একটি বাড়তি আস্থার জায়গা।
পাকিস্তানের স্বার্থ আবার ভিন্ন জায়গায়। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরবের বিনিয়োগ ও আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর পাকিস্তান নিজের আঞ্চলিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। এই জোট পাকিস্তানকে মুসলিম বিশ্বে একটি বাড়তি কূটনৈতিক গুরুত্ব এনে দিচ্ছে।
তুরস্কের স্বার্থ আবার তুলনামূলক বড় পরিসরে। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের একটি নেতৃস্থানীয় শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হলেও, আমেরিকার সঙ্গে তার সম্পর্কে মাঝেমধ্যেই টানাপোড়েন দেখা গেছে। তাই বিকল্প নিরাপত্তা ও প্রভাব বলয় তৈরিতে তুরস্কের আগ্রহ দীর্ঘদিনের।
এছাড়া তুরস্কের অস্ত্র ও ড্রোন শিল্প রয়েছে দ্রুত বিকাশমান। এই জোটের মাধ্যমে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়ছে আঙ্কারার জন্য।
প্রতিটি পক্ষের স্বার্থ ভিন্ন হলেও, একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট। বিশ্বব্যাপী পুরনো নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি আস্থা কমছে, আর নতুন জোট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আসল বিষয়টি শুরু হচ্ছে এখন।
প্রথমে আসি ভারত-আমেরিকা ট্যারিফ সংকটের বর্তমান অবস্থায়। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের আট আগস্ট, মার্কিন সিনেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করে।
এই বিলে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনা দেশগুলোর উপর একশ শতাংশ অতিরিক্ত ট্যারিফের প্রস্তাব রয়েছে। মূলত ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোকেই লক্ষ্য করে তৈরি এই বিল।
বিলটি সিনেটে পাস হয়েছে বিরাশি জন সিনেটরের সমর্থন আর মাত্র এগারো জনের বিরোধিতায়। অর্থাৎ, দুই দলের মধ্যেই এই বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য দেখা গেছে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এই বিল এখনো আইনে পরিণত হয়নি।
আইনে পরিণত হতে হলে এটিকে প্রতিনিধি পরিষদেও পাস হতে হবে। এরপর প্রয়োজন হবে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর।
তাই এই মুহূর্তে এটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি জোরালো হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে এর রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট, রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে আমেরিকার ধৈর্যের সীমা ফুরিয়ে আসছে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই মুহূর্তে এমন কঠোর পদক্ষেপের কথা ভাবছে ওয়াশিংটন? এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়।
প্রথম কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো থামেনি। বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কোনো টেকসই সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়।
আমেরিকার কংগ্রেসের একাংশ মনে করছে, রাশিয়ার তেল রাজস্ব বন্ধ না করলে যুদ্ধ থামানো কঠিন হবে। তাই তেল ক্রেতা দেশগুলোর উপর চাপ বাড়ানোকেই তারা সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার মনে করছে।
দ্বিতীয় কারণ, ভারতের অব্যাহত রুশ তেল আমদানি। আগের ট্যারিফ চাপ সত্ত্বেও ভারত তার রুশ তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়নি।
বরং কিছু বিশ্লেষণ বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই আমদানি বরং কিছুটা বেড়েছে। এতে ওয়াশিংটনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, আগের নরম চাপ কাজ করছে না।
তৃতীয় কারণ, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। রাশিয়ার প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়াকে অনেক মার্কিন আইনপ্রণেতা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
বিশেষ করে ইউক্রেনের পক্ষে জনমত এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী আমেরিকার কংগ্রেসে। তাই এই ধরনের কঠোর বিলে দুই দলের সমর্থন পাওয়া তুলনামূলক সহজ হচ্ছে।
এবার প্রশ্ন হলো, এই একশ শতাংশ ট্যারিফ কার্যকর হলে ভারতের জন্য এর অর্থ কী দাঁড়াবে? বিশ্লেষকদের মতে, এটি হবে ভারতের রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি ধাক্কা।
আমেরিকা ভারতের অন্যতম বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। এত উচ্চ ট্যারিফ কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্য আমেরিকার বাজারে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে বস্ত্র ও পোশাক খাত, রত্ন ও অলংকার শিল্প, এসব খাতে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য সুযোগের প্রসঙ্গ, যা নিয়ে আমরা একটু পরে আলোচনা করব।
তাহলে প্রশ্ন হলো, ভারত এখন কী করতে পারে? বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভারত হয়তো ধীরে ধীরে রুশ তেলের উপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করবে।
আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ভারত বিকল্প বাজার খোঁজার পাশাপাশি কূটনৈতিক সমঝোতার পথও খোলা রাখবে।
তবে এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, দিল্লি ঠিক কোন পথে হাঁটবে। এবার আসি দ্বিতীয় ঘটনায়, সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটের বর্তমান বাস্তবতায়।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, এই জোট আসলে কতটা শক্তিশালী?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির উপর সশস্ত্র হামলা মানে তিনটির উপরই হামলা। এই ভাষা অনেকটাই ন্যাটোর সেই বিখ্যাত পঞ্চম অনুচ্ছেদের মতো।
কিন্তু বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলছেন, কাগজে-কলমে অঙ্গীকার আর বাস্তবে সামরিক পদক্ষেপ, এই দুটো এক জিনিস নয়। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে আগের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পরও, ইরানের হামলার জবাবে পাকিস্তান সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা যায়।
তাই এই নতুন ত্রিপক্ষীয় চুক্তিও বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে কূটনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্বের দিক থেকে এই চুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই জোটের পেছনে মূল কারণগুলো একটু বিস্তারিত দেখা যাক। প্রথম কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক অস্থিরতা।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও আমেরিকার উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেন থেকে হুতিদের হামলার হুমকি অব্যাহত রয়েছে লোহিত সাগর অঞ্চলে।
দ্বিতীয় কারণ, আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর একাংশ মনে করছে, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি আগের মতো নিশ্চিত নয়।
বিশেষ করে দোহায় ইসরায়েলি হামলার সময় আমেরিকার প্রতিক্রিয়া নিয়ে অঞ্চলে প্রশ্ন উঠেছিল বলে জানা যায়।
এই প্রেক্ষাপটেই আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে বিকল্প নিরাপত্তা বলয় তৈরির দিকে ঝুঁকছে।
তৃতীয় কারণ, তুরস্কের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্নি মুসলিম বিশ্বে একটি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিতে চাইছে।
এই জোটে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তুরস্ক তার প্রভাব বলয় মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত করার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি নিজের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য নতুন বাজারও তৈরি হচ্ছে আঙ্কারার জন্য।
চতুর্থ কারণ, পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান নতুন মিত্র খুঁজছে।
মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তান এই জোটে একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, এই চুক্তিতে সরাসরি পারমাণবিক ছাতার প্রতিশ্রুতি নেই।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, মিসর শুরুর দিকের আলোচনায় অংশ নিলেও চূড়ান্ত চুক্তিতে যুক্ত হয়নি। তুরস্কের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে অন্য দেশও এই জোটে যোগ দিতে পারে।
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, জোটটি একটি বদ্ধ কাঠামো নয়, বরং সম্প্রসারণযোগ্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। এভাবেই এই জোট ভবিষ্যতে আরও বড় একটি আঞ্চলিক শক্তি জোটে রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করছেন কিছু বিশ্লেষক।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে ভবিষ্যতে কী দাঁড়াতে পারে?
প্রথমে আসি ভারত-আমেরিকা ট্যারিফ সংকটের সম্ভাব্য পরিণতিতে। এক্ষেত্রে অন্তত তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট বিবেচনা করা যায়।
প্রথম সম্ভাবনা, দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সিনেটের এই বিল মূলত দিল্লিকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর একটি চাপকৌশল।
যদি ভারত রুশ তেল আমদানি ধীরে ধীরে কমানোর অঙ্গীকার করে, তাহলে বিলটি হয়তো প্রতিনিধি পরিষদে গতি হারাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশ একটি নতুন বাণিজ্য কাঠামোয় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি। যদি বিলটি প্রতিনিধি পরিষদেও পাস হয় এবং প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করেন, তাহলে ভারতের রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন।
এতে দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদী টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় সম্ভাবনা, আংশিক সমাধান। ভারত হয়তো রুশ তেল আমদানি পুরোপুরি না কমিয়ে ধীরে ধীরে কিছুটা কমানোর পথ বেছে নিতে পারে।
এর বিনিময়ে আমেরিকা হয়তো একশ শতাংশের বদলে তুলনামূলক কম হারে ট্যারিফ বাস্তবায়ন করতে পারে।
এটি হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মধ্যম পথ, বিশ্লেষকদের একাংশের মতে।
এই সংকটের বৈশ্বিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভারতের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে রাশিয়ার তেল রপ্তানি আয়ে চাপ পড়তে পারে।
একইসঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়লে সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখানেই তৈরি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ।
যদি ভারতের রপ্তানি পণ্যের উপর সত্যিই এত উচ্চ ট্যারিফ কার্যকর হয়, তাহলে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বাড়তে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে, যেখানে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই বড় রপ্তানিকারক।
তবে এখানে সতর্কতা জরুরি। এই ধরনের সুযোগ পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, এবং তা নির্ভর করবে বিলটি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয় কি না তার উপর।
এবার আসি সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটের সম্ভাব্য ভবিষ্যতে। এখানেও অন্তত তিনটি দৃশ্যপট বিবেচনা করা যায়।
প্রথম সম্ভাবনা, জোটটি মূলত প্রতীকী পর্যায়ে থেকে যাওয়া। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বাস্তব সামরিক সংহতির চেয়ে কূটনৈতিক বার্তা দেওয়াই এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, জোট সম্প্রসারিত হওয়া। তুরস্কের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য মুসলিম দেশগুলোও ভবিষ্যতে এতে যুক্ত হতে পারে।
যদি এমনটা ঘটে, তাহলে এটি একটি বড় আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নিতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তৃতীয় সম্ভাবনা, বাস্তব সংকটে জোটের পরীক্ষা হওয়া। যদি ইরান বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটে, তাহলে জোটের প্রকৃত শক্তি যাচাই হয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে জোট যদি কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আবার সফল প্রতিক্রিয়া হলে এটি প্রকৃত অর্থেই একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এই জোটের বৈশ্বিক প্রভাবও দূরপ্রসারী হতে পারে। এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন জটিলতা যোগ করতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন।
একইসঙ্গে ন্যাটো সদস্য তুরস্কের এই ভূমিকা পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ সমীকরণেও প্রশ্ন তুলতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ওআইসি সদস্য দেশগুলোর জন্য এই জোট মুসলিম বিশ্বে নতুন কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে এই সম্ভাবনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, এবং ভবিষ্যতেই তা স্পষ্ট হবে।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, এই দুটি ঘটনা আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর হলো, দুটি ঘটনাই বিশ্ব রাজনীতির বড় পালাবদলের ইঙ্গিত বহন করছে। একদিকে অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে রাশিয়াকে চাপে ফেলার আমেরিকান কৌশল।
অন্যদিকে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রচেষ্টা।
তাহলে প্রশ্ন হলো, কোন পক্ষ সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে? স্বল্পমেয়াদে, বাংলাদেশের মতো বিকল্প রপ্তানিকারক দেশগুলো কিছুটা সুযোগ পেতে পারে, যদি ভারতের উপর সত্যিই উচ্চ ট্যারিফ কার্যকর হয়।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান, এই তিন দেশ কূটনৈতিকভাবে একটি বাড়তি সুরক্ষা বলয় পাচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত লাভবান কে হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের উপর।
কোন বিষয়টি পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে? ভারত-আমেরিকা সংকটে, প্রতিনিধি পরিষদের ভোট হতে পারে এক বড় নির্ধারক মুহূর্ত।
সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটে, ইরান বা অন্য কোনো পক্ষের সরাসরি হামলার ঘটনা হতে পারে জোটের প্রকৃত পরীক্ষা।
কোন ভুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে? অতিরিক্ত কঠোর ট্যারিফ ভারতকে রাশিয়া ও চীনের আরও কাছাকাছি ঠেলে দিতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন।
আবার নতুন প্রতিরক্ষা জোট যদি কোনো সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাস উভয় ঘটনার ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতের উপর একশ শতাংশ ট্যারিফের হুমকি এখনো চূড়ান্ত আইন নয়, তবে এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।
আর সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোট মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে যোগ করেছে নতুন এক মাত্রা।
দুটি ঘটনাই আলাদা হলেও, একটি অভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। বিশ্ব ক্ষমতার পুরনো কাঠামো এখন প্রশ্নের মুখে, আর নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
আপনার কী মনে হয়, এই দুটি ঘটনা থেকে বাংলাদেশ আসলে কতটা সুযোগ নিতে পারবে? নিচের মন্তব্যে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।