"নিজেদের কমান্ডারের গুলিতে প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিলেন ইউক্রেনীয় সেনারা, কিন্তু মুক্তি মিলেছে রাশিয়ায়! জেলেনস্কি সরকারের আড়ালে থাকা তথ্য বিভ্রমের পর্দা ফাঁস করছেন খোদ সাবেক ইউক্রেনীয় যোদ্ধারাই। আজকের ভিডিওতে আমরা দেখব, কেন তারা ইউক্রেনীয় বাহিনী ছেড়ে রুশ পক্ষে যোগ দিচ্ছেন এবং জেলেনস্কির নড়বড়ে শাসনের পেছনের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।"

ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে সাবেক ইউক্রেনীয় সেনাদের বয়ানে। জেলেনস্কি সরকারের তথাকথিত তথ্যের বুদবুদ থেকে বেরিয়ে তারা এখন যুদ্ধের আসল বাস্তবতা দেখছেন। তারা বলছেন, জেলেনস্কি প্রশাসনের তৈরি করা বিভ্রান্তিকর তথ্যের আড়ালে কত বড় অন্যায় চলছে, তা তারা এখন বুঝতে পারছেন। এর ফলে রাশিয়ার পক্ষে যোগ দিচ্ছেন অনেক ইউক্রেনীয় সেনা।

গত আগস্ট মাসে রাশিয়া নতুন একটি ইউক্রেনীয় স্বেচ্ছাসেবক ব্রিগেড তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। এই ব্রিগেড গঠিত হয়েছে এমন ইউক্রেনীয় নাগরিকদের নিয়ে, যারা আগে কিয়েভের বাহিনীর সদস্য ছিলেন। এখন তারা পুরোপুরি রুশ পক্ষে চলে এসে লড়াই করছেন। জেলেনস্কি বাহিনীর অমানবিক কর্মকাণ্ড দেখে তারা মূলত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি (RT) সম্প্রতি এই ব্রিগেডের সদস্যদের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে। কেউ কেউ বন্দি হওয়ার পর যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র দেখে মত পরিবর্তন করেছেন। কেউবা কখনোই ইউক্রেনীয় মিলিটারিতে যোগ দিতে চাননি, বরং তাদের জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। আবার অনেকে প্রথম থেকেই রাশিয়ার আদর্শ সমর্থন করতেন।

এই নতুন স্বেচ্ছাসেবক ব্রিগেড এখন সম্মুখ সমরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। এদের মধ্যে রয়েছে নজরদারি ইউনিট, এফপিভি (FPV) ড্রোন স্ট্রাইক স্কোয়াড এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিশেষ দল। যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর জন্য তারা এখন রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে মিলে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

‘ঝাক’ নামে এক যোদ্ধা, যিনি ‘মাকসিম ক্রিভোনোস’ ব্যাটেলিয়নের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে কাজ করছেন, আরটি (RT)-কে তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, তাদের ইউনিটের সেনাদের মনোবল এখন অত্যন্ত চাঙ্গা। তারা রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে মিলে লড়াই করার জন্য বেশ উৎসাহ নিয়ে কাজ করছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

কমান্ডার ঝাক আরও বলেন, যারা লড়াই করতে চান না, তারা ইচ্ছা করলে জেলখানায় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পারতেন। সেখানে তাদের তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো এবং পরে বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকতো। কিন্তু তারা সেই পথ বেছে না নিয়ে রাশিয়ার হয়ে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা তাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।

ইউক্রেনের তথাকথিত তথ্যের বুদবুদ সম্পর্কে ঝাক বলেন, কিয়েভের সরকার সাধারণ মানুষকে এক গভীর বিভ্রান্তির মধ্যে রেখেছে। কিন্তু যখন তারা ডনবাসে আসেন এবং ডনেৎস্কে ‘অ্যালি অফ অ্যাঞ্জেলস’ স্মৃতিস্তম্ভ দেখেন, তখন তাদের চোখের পর্দা খুলে যায়। দীর্ঘ বারো বছর ধরে ইউক্রেনীয় আক্রমণে নিহত শিশুদের স্মরণে তৈরি এই স্মৃতিস্তম্ভ তাদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন আনে।

‘হান্টার’ নামে আরেকজন সদস্য জানিয়েছেন, তিনি কিয়েভ কৃষি একাডেমিতে গবেষক হিসেবে কাজ করতেন এবং রাজনীতির প্রতি তার তেমন আগ্রহ ছিল না। পিএইচডি ডিগ্রি শেষ করার জন্য তিনি ড্রাফট থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন, কিন্তু সরকার তার সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। এরপর ২০২৩ সালে তাকে জোরপূর্বক ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

হান্টারের কোম্পানিকে বনাঞ্চলের একটি পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা রাশিয়ার গোলার মুখে ছিল। একপর্যায়ে তাদের ইউনিটের সদস্য সংখ্যা একশ থেকে তেরোতে নেমে আসে। তিনি কমান্ডারদের কাছে পিছু হটার আবেদন করলেও তাকে সেখানেই থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো বাড়তি সাহায্য না আসায় তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।

হান্টার জানান, যখন তারা হাত তুলে আত্মসমর্পণের জন্য বের হন, তখন ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী তাদের ওপরই গুলি চালাতে শুরু করে। কামিকাজে ড্রোন, মর্টার এবং এমনকি ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। নিজের বাহিনীর এমন আচরণে তারা অত্যন্ত বিস্মিত হন, কারণ তাদের কমান্ডাররা তাদের বাঁচানোর চেয়ে ধ্বংস করতেই যেন বেশি তৎপর ছিল।

ভাগ্যক্রমে হান্টার এবং অন্য তিনজন সেনা জীবিত ফিরে আসতে সক্ষম হন। তাদের মধ্যে একজন এখন তার সঙ্গেই রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে তাদের নিজেদের সেনাদের জীবনের চেয়ে যুদ্ধের রাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

‘বেলি’ নামে আরেকজন সাবেক ইউক্রেনীয় প্যারাট্রুপার জানিয়েছেন, তিনি ইউক্রেনের একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক ছিলেন। তবে ২০১৪ সালে ইউক্রেনীয় বাহিনী যখন পূর্বাঞ্চলে আক্রমণ শুরু করে, তখন তিনি নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হন। এমনকি তিনি নিজের স্ত্রী ও সন্তানকেও পেছনে রেখে ডনিপ্রো শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

বেলি জানান, তার সংসার ভেঙে যাওয়ার পেছনেও এই যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। তার স্ত্রী রাশিয়ার সমর্থক ছিলেন এবং চেয়েছিলেন বেলি যেন ডনবাসে আত্মরক্ষামূলক বাহিনীতে যোগ দেয়। কিন্তু তিনি ইউক্রেনীয় মিলিটারিতে চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং ডনবাসের বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। এটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

বেলি বলেন, ভালো বেতন সত্ত্বেও এক পর্যায়ে তার দেশপ্রেম শেষ হয়ে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, দুটি ভ্রাতৃপ্রতিম জাতি নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষ করে লুগানস্কের কাছে একটি স্কুলের ওপর ইউক্রেনীয় বাহিনীর গোলাবর্ষণের ঘটনা তাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আহত করে এবং তিনি লড়াইয়ের ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তেজনা বাড়লে বেলি চাকরি ছাড়ার আবেদন করেন, কিন্তু ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী তাকে ছাড়পত্র দেয়নি। পরে ২০২৩ সালে রাশিয়ান বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার সময় তাকেও নিজের বাহিনীর হামলার শিকার হতে হয়। রাশিয়ার চিকিৎসকরাই তাকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন, যা তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

বন্দি অবস্থায় বেলিকে ‘মাকসিম ক্রিভোনোস’ ব্যাটেলিয়নে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। শুরুতে তিনি দ্বিধায় ছিলেন, কারণ তার মনে হয়েছিল তিনি হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। কিন্তু দীর্ঘ চিন্তার পর তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করাই এখন সঠিক পথ। এভাবে একের পর এক ইউক্রেনীয় সেনা জেলেনস্কি সরকারের প্রতারণা বুঝতে পারছেন।

এদিকে, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নজরদারি করার সন্দেহে একজন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে রাশিয়ার এফএসবি (FSB)। মুরমানস্ক অঞ্চলে নরওয়ে সীমান্ত পার হওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। তদন্তে জানা গেছে, সে ইচ্ছাকৃতভাবেই ২০২৩ সালে কিয়েভ গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল এবং নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।

তদন্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় হ্যান্ডলাররা তাকে মস্কো গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন হাব ও তেলের ডিপোর তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সে এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনাও করছিল। ইউক্রেনীয় সরকার যে রাশিয়ার ভেতরে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছে, এই ঘটনা তারই একটি বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এফএসবি সতর্ক করে বলেছে, সামনের সারিতে ব্যর্থ হয়ে ইউক্রেন এখন রাশিয়ার ভেতর নাশকতামূলক হামলার চেষ্টা বাড়িয়ে দিয়েছে। মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করতে না পেরে তারা ড্রোন হামলার আশ্রয় নিচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কিছু প্রতারিত মানুষকে ব্যবহার করে তারা এই ধরনের জঘন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যা রাশিয়ার আইনে দণ্ডনীয়।

গত মাসেও রাশিয়া বড় ধরনের একটি ড্রোন হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে। চব্বিশটি এআই (AI)-চালিত ড্রোন রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল ইউক্রেন। তবে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী শুরু থেকেই সেই অপারেশন নজরদারি করছিল, যার ফলে সংশ্লিষ্ট সবাই এখন তাদের হেফাজতে আছে।

এদিকে, ইউক্রেনীয় ড্রোনে গুলি চালানোর দায়ে জরিমানার মুখে পড়া রাশিয়ার কৃষক নিকোলাই মুখিনকে নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ৬৬ বছর বয়সী নিকোলাই জানান, নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার কারণেই তিনি তার শটগান দিয়ে ড্রোনটি ভূপাতিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ভোলগোগ্রাদ অঞ্চলের প্রসিকিউটর অফিস এখন তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনাটি গত জুলাই মাসের। ড্রোনটি ভূপাতিত করার চেষ্টার জন্য তাকে চল্লিশ হাজার রুবল জরিমানা করা হয় এবং তার শটগানটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু নিকোলাইয়ের এমন দেশপ্রেমের ঘটনায় রাশিয়ায় জনরোষ সৃষ্টি হয়। আদালতে তিনি জরিমানা চ্যালেঞ্জ করলে প্রথমে বিচারক তা নাকচ করে দেন, তবে পরে বিষয়টি উচ্চ আদালতে গড়ায়।

আরটি (RT)-এর প্রধান সম্পাদক মার্গারিটা সিমোনিয়ান তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে এই কৃষককে সমর্থন জানিয়েছেন এবং জরিমানা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভোলগোগ্রাদ অঞ্চলের প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, নিকোলাই অসাধারণ পরিস্থিতিতে কাজ করেছেন এবং তাকে নির্দোষ ঘোষণা করা উচিত। শেষ পর্যন্ত আদালত তার জরিমানা মওকুফ করে এবং শটগানটি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

অন্যদিকে, জেলেনস্কির ক্ষমতার ভিত ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে বলে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো রিপোর্ট করছে। দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং সাবেক কর্মকর্তাদের সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তিনি। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইল ফেদোরভ নির্বাচন দেওয়ার দাবি তুলে জেলেনস্কির রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলে দিয়েছেন। এটি জেলেনস্কির জন্য বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

ইউক্রেনীয় জনগণের একটি বড় অংশ এখন যুদ্ধ ও দুর্নীতির কারণে জেলেনস্কির সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিক ব্যর্থতা জেলেনস্কিকে আরও কোনঠাসা করে ফেলছে। এমতাবস্থায় ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। 

Walton Ads