গেরিলা যোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো, বামপন্থীরা এই প্রথম কলম্বিয়ার কুর্সিতে
উপচে পড়ছে এস্টাডিও নেমেসিও কামাচো। এই স্টেডিয়ামটি কলম্বিয়ার (Colombia) রাজধানী বোগাতোর সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম। এসকোবার, ভলদেরামা, হ্যামেস রডরিগেজের দেশ এমনিতে ফুটবল পাগল। কিন্তু ভারতীয় সময় রবিবার গভীর রাতে কোনও ফুটবল ম্যাচ ছিল না।
তার কয়েক ঘণ্টা আগে লাতিন আমেরিকার এই দেশটির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে। তাতে ইতিহাস লিখেছে বামপন্থী (Left) পার্টিগুলোর জোট প্যাক্টো হিস্টোরিকা (হিস্টোরিকাল প্যাক্ট)। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন গুস্তাভো পেত্রো (Gustavo Petro)। আর সেই উপচে পড়া স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে কলম্বিয়ার মানুষের উদ্দেশে নতুন রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো বললেন, “আপনারা ইতিহাস লিখেছেন। আমি আপনাদের মর্যাদা রাখব। বড় লোক আর এই দেশে আরও বড় লোক হবে না। যে মানুষ অভাবে কাটাচ্ছেন, তাদের ঘরে জ্বলবে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকরির রঙমশাল।”
তাঁর বিরুদ্ধে দক্ষিণপন্থীদের প্রার্থী ছিলেন ধনকুবের রডলফো হার্নান্ডেজ। ফল ঘোষণার পর দেখা গেল, একদা গেরিলা যোদ্ধা গুস্তাভো পেত্রো হার্নান্ডেজকে হারিয়েছেন সাত লক্ষ ভোটে।
এই প্রথম কলম্বিয়ার মাটিতে কোনও বামপন্থী নেতা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। ফলে যা দাঁড়াল তা হল এই, ব্রাজিলে বলসোনারোকে বাদ দিলে গোটা লাতিন আমেরিকাই এখন বামেদের দখলে।
গত ডিসেম্বরে যখন চিলির ক্ষমতায় এলেন তরুণ বাম নেতা গ্যাব্রিয়েল বরিক, সেই সময়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ চিলি করে দেখাল। আর কয়েক মাস অপেক্ষা করুন, কলম্বিয়াও তার লড়াইয়ের দাম পাবে।’
দেখা গেল হলও তাই। গত তিন-সাড়েতিন বছর ধরে কলম্বিয়ার দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল গণ আন্দোলন। মূলত ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল হচ্ছিল কলম্বিয়া। এই সময়ে অন্তত ৩১ জন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়েছে। সেই তীব্র সরকার বিরোধিতা কার্যত বামেদের ভোট বাক্সে সমর্থনের সুনামি বইয়ে দিল।
গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অধিকাংশ বাম দল এক ছাতার তলায় এসেছিল। তাদের মিলিত ভোট ছিল ৩০.৮২ শতাংশ। আর এবার? গুস্তাভো পেত্রো পেয়েছেন ৫০.৪ শতাংশ। বিপরীতে, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণপন্থী হার্নান্ডেজের পক্ষে সমর্থনের হার ৪৭.৩ শতাংশ।
একুশ বছর বয়সে শহুরে গেরিলা গ্রুপ এম-১৯ এর সঙ্গে যোগ তৈরি হয়েছিল গুস্তাভোর। অস্ত্র হাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নামার জন্য জেলে থাকতে হয়েছিল বেশ কয়েক বছর। তারপর অবশ্য গুস্তাভো-সহ ওই গ্রুপের বেশ কিছু নেতা জনযুদ্ধের লাইন ছেড়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থা রাখতে শুরু করেন। ২০১১ সালে বোগাতোর একটি ছোট শহরের মেয়র হয়েছিলেন গুস্তাভো।
আরও একটি ইতিহাস লিখেছে কলম্বিয়া। উপরাষ্ট্রপতি পদে জিতিয়েছে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীকে। তাঁর নাম ফ্র্যান্সিয়া মার্কুয়েজ। আদ্যপান্ত ঘরগেরস্থ এই মহিলা গত কয়েক বছর ধরে সংসার সামলে আন্দোলনের রাস্তায় নেমেছিলেন। পুলিশের মার খেয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন, জামিন পেয়ে সংসারে ফিরেছেন আবার আন্দোলনের রাস্তায় নেমেছেন। সেই তাঁকেই উপরাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছিল বাম জোট। তিনিও জিতেছেন বিপুল ভোটে। তারপর গুস্তাভোর সঙ্গে এস্টাডিও নেমেসিও কামাচো দাঁড়িয়ে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “এল পুয়েবলো ইউনিডো, জামাস সেরা ভেনসিডো।” যার অর্থ, মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে, জয় সুনিশ্চিত।খবর দ্য ওয়ালের /এনবিএস/২০২২/একে
