ইরানের রণক্ষেত্রে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিসাইল হামলা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, তখন সেই উত্তাপ আছড়ে পড়েছে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটাল হিলেও। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযান কি শুধুই ‘আত্মরক্ষা’, নাকি কংগ্রেসের ক্ষমতা পাশ কাটিয়ে নেওয়া এক স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ? এই প্রশ্ন নিয়েই উত্তাল মার্কিন রাজনীতি।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন সিনেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আনা হলেও, রিপাবলিকানদের শক্ত সমর্থনে তা বাতিল হয়ে গেছে। বুধবার সিনেটে প্রস্তাবটি ৪৭-৫২ ব্যবধানে নাকচ হয়। বিদেশের মাটিতে ট্রাম্পের সামরিক তৎপরতা সীমিত করার পক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের জন্য এটি বড় ধাক্কা। একই প্রস্তাব বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদে উঠলেও পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সিনেটে দিনভর দুই পক্ষের উত্তপ্ত বিতর্ক চলে। প্রস্তাব সমর্থকরা দাবি করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্প তার সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করেছেন। মার্কিন সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে কেবল ‘আত্মরক্ষার’ জন্যই প্রেসিডেন্ট আক্রমণ চালাতে পারেন। অন্যথায় যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা কংগ্রেসের।
সিনেটর টিম কেইন বলেন, “গোপনীয় ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি যে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসন্ন হামলার হুমকি ছিল।” তিনি বলেন, “আপনি এটিকে সামান্য আঘাত বলতে পারেন না যা যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে না; আর বলতে পারেন না যে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো স্থল সৈন্য নেই।”
রিপাবলিকানদের সমর্থন
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছিল, যা গত বছরের হামলায় ধ্বংস হয়েছিল। এছাড়া ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইসরায়েল ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত দিতে পারে। তবে পরে ট্রাম্প বলেছেন, মূলত ইরানই ইসরায়েলের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিল। রিপাবলিকান সিনেটর জেমস রিশ দাবি করেন, গত ৪৭ বছর ধরে ইরানের শত্রুতামূলক আচরণই প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপ বৈধ করে।
যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ধোঁয়াশা
পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, সামরিক অভিযান মাত্র শুরু হয়েছে এবং আরও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। যুদ্ধের সময়সীমা অস্পষ্ট হলেও ট্রাম্প ধারণা দিয়েছেন এটি চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ বা তার বেশি স্থায়ী হতে পারে। সিনেটর রিশ আশাবাদী এটি চিরস্থায়ী নয়।
ভোটাভুটির গুরুত্ব
সিনেটে প্রস্তাব পাস হলেও আইন হওয়ার পথে অনেক বাধা ছিল। প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়ার পর ভেটো ক্ষমতা থাকায় কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব।
বিশ্লেষকরা মনে করেন ভোটাভুটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন’-এর হাসান এল-তায়াব বলেন, ‘এটি দেখায় নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা পরীক্ষা করতে এবং অন্তহীন যুদ্ধ রোধ করতে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’
অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘ডিমান্ড প্রগ্রেস’-এর সিভন খারজিয়ান বলেন, নির্বাচনের বছরে ভোটাররা মনে রাখবে যারা ‘অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয়’ যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, তারা মূলত জনগণের ইচ্ছা ও সেনাদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
